It is possible
Skip to toolbar

পিউ

চিলেকোঠায় একটা পাখি অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে পাখিটার খুব কষ্ট হচ্ছে। পাখিটাকে দেখে আমার খুব মায়া হলো। আমি পাখিটাকে বাসায় নিয়ে গেলাম।

বরাবরের মতোই মা আমার হাতে পাখি দেখে ভীষণ রেগে গিয়ে বললো, আবার তুই বাসায় পাখি নিয়ে এসেছিস? যাহ, পাখিটাকে তার বাসায় দিয়ে আয়। আমি মাকে সব কথা খুলে বললাম। মা আর আপত্তি করেননি, পাখিটাকে আমাদের ঘরে থাকার অনুমতি দিয়েছেন।
আমার সেবায় পাখিটা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। এখন সে একটু একটু উড়তে পারে। পুরোপুরি সুস্থ হতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।
প্রতিদিন সকালে পাখিটার ডাকে আমার ঘুম ভাঙে। সারাদিনের বেশিরভাগ সময় আমি পাখিটার সাথেই কাটাই। আমি বাইরে কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলে পাখিটা আমার সাথে যাওয়ার জন্য বায়না ধরে। আমি বাসায় ফিরে আসলে অনাবিল আনন্দে পুরো বাড়ি উড়ে বেড়ায়। ওর সাথে আমার একটা আত্মার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। আমি পাখিটার একটা নাম দিয়েছি, “পিউ”।

আমি যতক্ষণ বাসায় থাকি ততক্ষণ পিউ আমার পিছু ছাড়ে না। তাতে অবশ্য আমার ভালোই লাগে।

পিউ এখন পুরোপুরি সুস্থ। আমি ওকে খাঁচায় বন্দী করে রাখি না। তবুও পিউ বাসার বাইরে বের হয় না। আমি যদি ও কে বাইরে থেকে ঘুরে আসতে বলি। জবাবে ও মাথা নাড়ে হয়তো বলতে চায়, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না।

মা আমার উপর ভীষণ রেগে আছে। মায়ের অভিযোগ আমি নাকি সারাদিন পাখিটার সাথেই সময় কাটাই, পড়াশোনা একদম করি না। মা বারবার বলছে পাখিটাকে বের করে দিতে।

নাহ, আমি পিউকে ছেড়ে থাকতে পারবো না, মাকে এটা বলে আমি পিউকে নিয়ে আমার ঘরে চলে এলাম।

বেশ কিছুদিন পর খালামনি আমাকে ফোন দিয়ে বললো ওদের বাসায় যেতে। আমি রাজি ছিলাম না। কারণ আমি কোনোভাবেই মায়ের ভরসায় পিউকে রেখে যেতে পারছিলাম না। সাথে করে যে নিয়ে যাব তারও উপায় নেই। শেষমেশ খালামনির জোরাজুরিতে রাজি হতে বাধ্য হলাম।

ALSO READ  "Haha React"

তিনদিনের জন্য যাচ্ছি। মনটা একদম সায় দিচ্ছে না। যাবার আগে পিউকে বললাম, একদম দুষ্টুমি করবি না, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করবি, আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো।

পিউ আমার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ওর কাতর দৃষ্টি যেনো আমাকে বলতে চায়, “যেওনা আমাকে ছেড়ে, যেখানেই যাচ্ছো আমাকেও নিয়ে চলো”। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেই তো সবকিছু করা যায় না। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও পিউকে সাথে নিতে পারলাম না।

পৌঁছে গেলাম আমার গন্তব্যে। বরাবরের মতো এবারও খালামনি আমার খুব যত্ন করলো। খালাতো ভাইবোনেরা আমাকে নিয়ে ঘুরতে বের হলো। ওরা নানাভাবে আমাকে আনন্দে মাতিয়ে রাখার চেষ্টায় ব্যস্ত। এতোকিছুর মাঝেও যেনো আমি আনন্দ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বারবার মনে হচ্ছিলো পিউ ঠিক আছে তো? খেয়েছে তো? নাকি আমার জন্য মন খারাপ করে না খেয়ে বসে আছে?

দুদিন পর মা ফোন দিল। ফোনের ওপাশ থেকে মায়ের কথা শুনে আমার পায়ের তলার মাটি সরে গেলো।

খালামনিকে বলে ঝড়ের বেগে বাসার উদ্দেশ্য ছুটলাম। বাসায় ফিরে যা দেখলাম সেটা দেখার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।

পিউ ডানা ঝাপটিয়ে ছটফট করছে। আমি দৌড়ে গিয়ে পিউকে মাটি থেকে তুললাম। মা অপরাধী কন্ঠে বলছে দুদিন অনেক চেষ্টা করেও কিচ্ছু খাওয়াতে পারি নি। তারপর তোকে ফোন দিলাম।

আমি পিউকে নিয়ে আমার ঘরের দিকে ছুটলাম। কিন্তু ততক্ষণে ওর প্রাণ টা দেহ থেকে বেরিয়ে গেছে। হয়তো আমার আসার অপেক্ষায় ছিলো।

আর সুযোগ পেলাম না ও কে সুস্থ করার। বড্ড অভিমানী ছিলো, ও কে সুস্থ করার সুযোগ টাই দিলো না আমাকে। নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিলো। পিউকে জরিয়ে ধরে খুব কাঁদলাম।

মনে হচ্ছিলো, আমার দেহ থেকে কেউ আত্মা টা আলাদা দিয়েছে।

আমার নিজেকে খুব বেশি অপরাধী মনে হচ্ছিলো। বারবার ভাবছিলাম ওর এ অবস্থার জন্য হয়তো আমিই দায়ী। আমি যদি খালামনির বাসায় না যেতাম বা ও কে সাথে নিয়ে যেতাম তাহলে হয়তো আজকে ও বেঁচে থাকতো। পুরো বাড়ি উড়ে বেড়াতো।

ALSO READ  চিব়চেনা

ওর ভালোবাসার সাথে আমার ভালোবাসার তুলনা চলে না। তবুও বড্ড কষ্ট হচ্ছে।

অবশেষে পিউকে চিরবিদায় দিয়ে এলাম।

আমার পুরো ঘরে ওর স্মৃতি গুলো ভেসে উঠছে। বারবার শুনতে পাচ্ছিলাম পিউ আমাকে বলছে, কেন আমাকে একা ফেলে চলে গেলে তুমি? কেন আমাকেও সাথে নিয়ে যাও নি? তুমি জানো না আমি তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারি না?

মনে মনে ভাবছিলাম পিউরা কখনো স্বার্থপর হয়না, ওরা জীবন দিয়ে ভালোবাসতে জানে। স্বার্থপর তো হয় আমাদের মতো মানুষেরা, যারা নিজের স্বার্থের জন্য পিউদের মতো পাখিদের কষ্ট দেয়।

ওপারে ভালো থাকিস। যদি সম্ভব হয় তোর স্বার্থপর বন্ধুটাকে ক্ষমা করে দিস।

More From Author

    None Found

What’s your Reaction?
+1
2
+1
24
+1
+1
+1
5
+1
+1
3
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x