Build quality relationships
Skip to toolbar

স্বেচ্ছাবন্দির নামচা : নেতারহাট পর্ব

                  পালামৌ পর্বে ঘন জঙ্গল আর জন্তু জানোয়ারের গল্প শুনিয়েছিলাম।সবুজের প্রতি আমার এই আকর্ষণ বা মোহ যাই বলুন- বোধহয় আমার জঙ্গলপ্রেমের উৎস।বুদ্ধদেব গুহর একনিষ্ঠ পাঠক আমি- মাধুকরী, কোয়েলের কাছে, সবিনয়ে নিবেদন আমার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে।স্বপ্নে কতদিন যে পৃথুর মতো গভীর জঙ্গলে জীপ্ নিয়ে অচেনা গহন পথে ছুটে বেড়িয়েছি-রোমান্টিসিজম এর অলীক কল্পনা আর কি।

               পালামৌ ছেড়েছিলাম সকাল সকাল, বাস স্টপে পৌঁছে তার চেহারা দেখে খানিকটা অস্বস্তিই হয়েছিল –কিন্তু যেতে তো  হবেই, অগত্যা সেঁধিয়ে গেলাম কোনোমতে। পকেটের রেস্ত কমে আসছে- ১০০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হবে স্থানীয়দের সঙ্গে- ভিড় বাস আর আর সাথের মালপত্তর -বাস হেলছে দুলছে আর সেই সঙ্গে মাঝে মধ্যেই প্যাঁক প্যাঁক- আদ্যিকালের সেই বাসের হর্ন অনেকেরই হয়তো মনে আছে।লাতেহার রেঞ্জ এর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা, চারদিকে কত যে গাছ- কিছু জানা- বেশিরভাগটাই অচেনা।একটা অদ্ভুত সুন্দর জায়গায় বাসটা কিছুক্ষন দাঁড়িয়েছিল, নেমে চা খেলাম- অমৃতের স্বাদ।  জায়গাটার নাম মহুয়াডোর, সুন্দর মায়াবী নাম, শান্তি আর সৌন্দর্য তার গায়ে চাদরের মতো জড়িয়ে আছে- আহাঃ, এখানে যদি ছোট্ট একটা ঘর থাকতো আমার।আজ ভাবলে হাসি পায়- কারিগরি শিক্ষার ধারক আমি- ছেঁদো রোমান্টিকতা তখন ছিল আমার নিত্যসঙ্গী।ঘন্টা আড়াই তিন যাওয়ার পর রাস্তা একটু খারাপ হতে লাগলো, মনে হয় ঘাট রাস্তায় পড়লাম আমরা- পাহাড়ে উঠতে হবে যে- রাণীর নাগাল পাওয়া কি এতো সোজা।ওমা -বেশ কয়েকটা বাঁক পেরিয়ে উপরে উঠতে উঠতে বাসটা হঠাৎ একজায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লো যে।আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়- বাস এবার পিছোচ্ছে যে- একটু এগোয়, একটু পিছোয়- হলটা কি? আমি তখন নামার প্রচেষ্টায়, কিন্তু নামবো কোথায়- পুরো রাস্তা জুড়েই যে এতবড়ো বাস।অগত্যা জানলা দিয়ে মুখ বাড়ালাম-হেয়ারপিন বেন্ড, ইউ টার্ন- অনেক দেখেছি পরবর্তী জীবনে, কিন্তু সেদিনের সেই রাস্তার অদ্ভুত কঠিন ভাঁজের কথা ভাবলে আজও শিউরে উঠি।হাতে, পায়ে, কোমরে- মানে প্রায় সর্বাঙ্গে ব্যাথা নিয়ে ঘন্টা চার পাঁচেক পরে পৌঁছেছিলাম নেতারহাট- সত্যিই সে ছোটোনাগপুরের রাণী- অপরূপ তার মায়াজাল-পাহাড়ের বুকে জঙ্গল ছড়িয়ে দিয়েছে সবুজের বাহার- আর সুন্দরী কোয়েল অনেক নিচে বয়ে চলেছে – ঈশ্বর তুমি সত্যি মহান শিল্পী।

ALSO READ  Shrift - Joyanta Basak : 1st Place Winner

নেতারহাট বাস স্টপে নামতেই যা দেখলাম, তাতে হাড় হিম হওয়ার জোগাড়।তখন ব্যাগপত্তর নামাতে ব্যস্ত আমরা- অদ্ভুতদর্শন একটা লোক এগিয়ে এলো- তার মুখ মনে পড়লে আজও ভয়ে কাঁটা দেয় গায়ে।তার কথার এক বর্ণও বুঝিনি আমরা-কন্ডাক্টরের সাথে কথোকপথনের পর তার ত্রিভঙ্গমুরারি চেহারার ইতিহাস উদ্ধার হলো।জঙ্গলে ভালুকের পাল্লায় পড়েছিলেন ইনি-ভালুক আসে মহুয়ার ফল খেতে- সামনাসামনি পড়ে পালতে পারেনি- হাত পা মুখ প্রায় সবই বিকৃত করে ছেড়েছে ভালুকবাবাজি। এরকম দৃশ্য দেখলে সব নেশাই ছুটে যায়- প্রকৃতি তো কোন ছার, আমরা তখন হোটেলে ঢুকতে পারলে বাঁচি।কোথায় উঠেছিলাম আজ ঠিক মনে পড়ছে না- ইয়ুথ হোস্টেল এর মতো কিছু একটা হবে- তবে সেখানকারকার বুধনকে আজও আমরা বন্ধুবান্ধবদের আড্ডায় মাঝেমধ্যেই তুলে আনি- তার গল্পও শোনাবো। অনেক গল্প বাকি রয়ে গেছে- ঘাগরি বোনেরা, অঞ্জন গুহা আর সর্বোপরি সুন্দরী ম্যাগনোলিয়া এদের ছোঁয়া পাওয়া যে এখনো বাকি।আজ বড্ডো শ্রান্ত হয়ে পড়েছি- বুধনের দৌলতে দুপুরে মনে হয় ভালো কিছুই জুটবে।

সময় বড়ো কম, তাই প্রথমেই বুধনের শরণাপন্ন হয়েছিলাম- সস্তার জীপ্ চাই একটা।কিছু লোক থাকে সর্বঘটে কাঁঠালীকলা- বুধনও তাই। রান্না করা, বাসনমাজা, কাপড়কাচা থেকে জোগাড়ে পর্যন্ত সব কলাই তার করায়ত্ত।প্রথমেই ছুটলাম একটু দূরে অঞ্জন গুহার দিকে।রামায়ণে কথিত আছে, অঞ্জনি গ্রামের এই গুহায় হনুমান এর জন্ম।হনুমান আর বায়ু এই গুহার চারপাশে খেলা করতো আর বিস্তীর্ণ এই বনের ফলমূল সংগ্রহ করে খেত।একদিন ভোরে ফল খুঁজে না পেয়ে, খিদের জ্বালায়,সে নাকি ফল ভেবে উদীয়মান সূর্যকে গিলে খেতে গিয়েছিলো।এগুলো সব পুরাণের কথা, ড্রাইভারের মুখ থেকে শোনা- তার সত্যতা যাচাই করার ইচ্ছে বা ক্ষমতা কোনোটাই তখন আমাদের ছিল না।বহু পুরোনো গুহা, বিশেষ কিছুর অস্তিত্ব তার মধ্যে আর নেই, শুধু পৌরাণিক গাথা জড়িয়ে থাকার জন্য ইতিহাস নিয়ে হয়তো আজও রয়ে গেছে।এরপর দেখেছিলাম ব্রিটিশ আমলের চ্যালেট হাউস, সাহেবরা বোধহয় গ্রীষ্ম আবাস হিসেবে এটা বানিয়েছিলো- তখনও সেটা ভগ্নদশায় পৌঁছায়নি- রক্ষনাবেক্ষনের দু চারজন স্থানীয় লোককে ভিতরে দেখেওছিলাম।বাজারে নাসপাতি দেখেছি- তাই বলে আস্ত একটা নাসপাতির বাগান? নেতারহাটে তখন তাও ছিল- বাক্স ভোরে চালান যেত ডাল্টনগঞ্জের বাজারে।নেতারহাটের ঐতিহ্যময় পাবলিক স্কুলের কথা আগেই শুনেছিলাম, সেটা না দেখে কেউ ফিরতে চাইছিলো না।সাহেবরা হয়তো তখন আর ছিল না- কিন্তু স্কুলের বাইরে থেকেই তার আভিজাত্যের আঁচ পাওয়া যাচ্ছিলো- কেতাদুরস্ত ছেলেমেয়েরা- তাদের চলাফেরা হাবভাবের সঙ্গে নেতারহাটের মহুয়ার গন্ধকে কিছুতেই মেলানো যাচ্ছিলো না।

ALSO READ  পোড়া বসন্ত

দুপুরে খেয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম- বুধনের রান্নার হাত বেশ ভালো, দেশি মুরগির স্বাদ বন্যতায় বোধহয় অন্যরকম হয়।সারাসকাল বাসযাত্রার পর এতো ঘোরাঘুরি আর শরীরে সহ্য হচ্ছিলো না।ফিরে এসেছিলাম ডেরায়, একটু শোয়া দরকার- শরীরের নাম মহাশয়, কিন্তু তাই বলে বিশ্রামকে বিদায় জানানো বড়ো কষ্টের- পাহাড়ি সন্ধ্যের আড্ডাটা তো জমাতেই হবে।পাহাড়ে অন্ধকার নামলো ঝপ করে- সে দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য  আমাদের পরে হয়েছিল- তাসের আড্ডা আর বুঝতেই পারছেন- ছজন সদ্যযুবা একসঙ্গে হলে- আরও অনেক নেশাই সঙ্গী হয়েছিল সেই সন্ধ্যেয় – কত প্রেম, কত ভালোবাসা যে সেদিন ডুকরে কেঁদেছিলো, আজও আলোচনায় সে কথা উঠে আসে।কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই। উফফ, বুধনটা পারেও- কত সকালে যে উঠেছে- গরম চায়ের পর যা জুটলো তা বাড়িতে বসে পাওয়াও চরম সৌভাগ্য।পুরি আর সবজি, মানে আবার সেই আলুর তরকারি- একেবারে ধোঁয়া ওঠা, মিঠে সকালটায় ঠিক যেরকম চাইছিলাম- একদম সেইরকম।বেরোতে তো হবে, কিন্তু প্রথমে যাবো কোথায় ঠিক করতে করতেই অনেক সময় চলে গেলো।শেষে বুধনের পরামর্শে চলে গেলাম- ঘাগরি জলপ্রপাত দেখতে।এরা বোধহয় দুই বোন, যতদূর মনে পড়ে দুজনেরই উৎস ঔরঙ্গার নদীখাত থেকে।নেতারহাট এর একটু কাছে যিনি আছেন তার নাম আপার ঘাগরি, আর একটু দূরে লোয়ার ঘাগরি।এই আপার লোয়ার ব্যাপারটা আমার কাছে আজও ধোঁয়াশা- আপার ঘাগরিকে ঠিক জলপ্রপাত বোধহয় বলা চলে না- সামান্য উঁচু থেকে কয়েকটা ধারায় পাথর বেয়ে নেমে আসা জলরাশি।আমার এক বন্ধুর উৎসাহ অসামান্য- এডভেঞ্চার এর নেশায় সেই ঠান্ডা জলস্রোতে তার স্নানের সেই ছবি- আমিই তুলেছিলাম- দুদিন আগের কথোকপথনে সেই ঘটনা উঠে আসায় তার প্রশ্ন ছিল-“তোর কাছে সেই ছবি এখনো আছে?”- দেখাবি আমায়, স্মৃতি সতঃতই সুখের।

জীপ্ আঁকাবাঁকা পথ ধরে যেখানে পৌঁছে দিয়েছিলো, সেখান থেকে অনেকটা হেঁটে পৌঁছেছিলাম লোয়ার ঘাগরি- এখানে জলের ধারা পড়ছে অনেক উঁচু থেকে আর ধারার সংখ্যাও অনেক বেশি।বর্ষাকালে এর রূপ বোধহয় অনন্য হবে- পাথরে আছড়ে পড়ে সাদা জলরাশির ফেনা যেন কুচি বরফের চাদর।অনেক উপর এবং যথেষ্ট দূর থেকে নিচের জমা হওয়া সবুজ জলরাশি দেখে লিরিল এর সেই বিজ্ঞাপনটা বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো- আঃহা- যদি এখনই এখানে সেই শুটিং এর অ্যাকশন রিপ্লে হতো।দুপুর হয়ে গেলো- তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে- আজ পড়ন্ত বেলায় ম্যাগনেলিয়া যে অনেক আশা নিয়ে বসে থাকবে।আবার সেই দুপুরের ভাতঘুম- না বুধনকে বলে রাখতে ভুলিনি- বিকেল বিকেল উঠিয়ে দিয়েছিলো আমাদের।নেতারহাট থেকে নাকি সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই খুব ভালো দেখা যায়।কিন্তু আমি যে ঘুমকাতুরে, সূর্যোদয় দেখার সৌভাগ্য যে আমার হবেনা সেটা ভালোই জানতাম।কখন যে দশ কিলোমিটার পথ উজিয়ে ম্যাগনেলিয়া পয়েন্টে পৌঁছে গেলাম, তা বুঝতেই পারিনি।এ জায়গাটার নাম এরকম কেন? প্রশ্নের উত্তরে ড্রাইভার শোনাল এক করুন কাহিনী- ব্রিটিশ কন্যা সুন্দরী ম্যাগনেলিয়া কোনো এক অজানা কারণে নিজের জীবন বিসর্জন দেয় এই পাহাড় থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ে।কি অদ্ভুত, তাই না- কারো আত্মহুতি জায়গার নামমাহাত্য যে বাড়িয়ে দেয়- এটাও সেদিন জানলাম।পাহাড়ের উপর থেকে সুতোর মতো কোয়েলকে দেখা যাচ্ছে- সূর্যিমামা প্রায় ঢলে পড়েছেন- আমি ক্যামেরার শাটারে হাত দিয়ে প্রস্তুত- আজ এই দৃশ্য আমার ফ্রেম এ বন্দি হবেই।সেটা ঘটলো- কিন্তু সময় দিলো খুব কম- মনে হলো এক মুহূর্তের মধ্যে একটা লাল বল অনেক নিচে কোয়েলকে ছাড়িয়ে ডুব দিলো- পৃথিবীকে এক লহমায় ভরিয়ে দিলো অন্ধকারে।

ALSO READ  কবিকে স্মরণ

নেতারহাটে আর বিশেষ কিছু দেখার বাকি ছিল না- ফিরেছিলাম পরেরদিন- বন্যতার আদিম গন্ধ গায়ে মেখে শহুরে যান্ত্রিকতার মধ্যে।শুরু করেছিলাম ভ্রমণকাহিনী লিখব ভেবে, ঘটনার বর্ণনায় সেটা যে কখন রোজনামচার গল্পে বদলে গেল বুঝতেই পারিনি- কিন্তু এ অভ্যেসের আজই ইতি দিতে হবে।আবার যদি কলম আর মন একসাথে আমায় জোরজার করে- ফিরে আসবো  নতুন আর এক ঘটনা দুর্ঘটনায় ভরা ঘুরে বেড়াবার গল্প নিয়ে।

More From Author

    None Found

What’s your Reaction?
+1
14
+1
2
+1
1
+1
+1
+1
+1
4
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x