রাফিয়া এবং রাকাব ছোট বেলার সহপাঠী। তাদের বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসার উদাহরণ দেয়া হতো স্কুলে। ছোট বেলার সেই বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসা  স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে একটি সুন্দর সংসারে পরিণত হয়েছে। 

দুজনের মধ্যে যথেষ্ট বোঝাপড়া আছে এটা মানতেই হবে। তবে একটু মনযোগ সহকারে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, দুই জনের মানসিকতার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। 

যেমন রাফিয়া খুব সাহসী। সে সবসময় চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করে এইতো সেই দিন বড় ছেলে রাফিদ যখন বললো কোয়ারান্টাইনের অনুভূতি নিয়ে একটি ভিড়িও বানাতে রাফিয়া ছেলের আবদারে রাজি হয়ে গেল এবং ভিডিও বানিয়ে তৎক্ষনাৎ সোশ্যাল মিডিয়াতে দিয়ে দিল।  

অপরদিকে রাকাব যেন অন্যমেরুর একজন মানুষ। পরিষ্কারভাবে বুঝাতে গেলে রাফিয়া যদি 6 হয় তবে রাকাব হবে 9| ছেলের আবদারে রাফিদ ক্ষুব্ধ হয়ে গেল এবং বললো সোশ্যাল মিডিয়াতে তার সহকর্মী এবং বস ও রয়েছেন। সে এই ধরনের ভিড়ি বানাতে পারে না এবং ভিড়িও বানানোর চ্যালেঞ্জ প্রত্যাখ্যান করে দিল।    

স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী Carol Dweck এর ভাষ্যমতে মানুষের মধ্যে এই ধরনের পার্থক্যকে বলা হয় মানসিকতা বা মাইন্ডসেট। 

তাঁর মতে মানুষের মানসিকতা/ মাইন্ডসেট মূলত দু’ ধরনের হয়ে থাকে 

১. ফিক্সড মাইন্ডসেটঃ এই ধরনের মানুষের মানসিকতা অপরিবর্তিত বা স্থির থাকে বলে একে বলা হয় ফিক্সড মাইন্ডসেট। ফিক্সড মাইন্ডসেটের অধিকারী মানুষের কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকে যার মাধ্যমে এদের সহজেই অন্যদের থেকে আলাদা করা যায়। চলুন সেই বৈশিষ্ট্য গুলো জানা যাক

  • এরা চ্যালেঞ্জ নিতে চায় না
  • এরা ফিডব্যাক কে সবসময় সমালোচনা মনে করে
  • এরা পরিশ্রম ছাড়াই ফল প্রত্যাশা করে
  • এরা সহজেই যেকোন কিছুতে হাল ছেড়ে দেয়
  • এরা ব্যর্থতা মেনে নিতে পারে না
  • ব্যর্থতার জন্য পরিস্থিতিকে দায়ী করে 
  • নতুন কিছু শেখার আগ্রহ তাদের মধ্যে কম বা নেই বললে চলে    

   

যদি আমরা উপরের দৃষ্টান্তটি আরেকটু খেয়াল করি তাহলে দেখবো যে রাকাব ফিক্সড মাইন্ডসেটের অধিকারী।      

২. গ্রোথ মাইন্ডসেট আমাদের ব্লগের আজকের বিষয়বস্তু হলো গ্রোথ মাইন্ডসেট। চলুন জানা যাক বিষয়টা সমপর্কে। 

নাম শুনেই বুঝা যাচ্ছে এই ধরনের মানুষের মানসিকতা প্রতিনিয়ত সময়, পরিস্থিতি ইত্যাদি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়ে থাকে।      

গ্রোথ মাইন্ডসেটের অধিকারী মানুষের কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকে যার মাধ্যমে এদের সহজেই ফিক্সড মাইন্ডসেটের মানুষদের থেকে আলাদা করা যায়। চলুন সেই বৈশিষ্ট্য গুলো জেনে নেয়া যাক।

  • এরা সবসময় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে থাকে
  • এরা প্রত্যেক কাজের জন্য ফিডব্যাক নিয়ে থাকে
  • এরা পরিশ্রমের মাধ্যমে যথাযথ ফলাফল প্রত্যাশা করে
  • এরা সহজে হাল ছাড়ে না।
  •      এরা ব্যর্থতা মেনে নিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করে।
  •      এরা ব্যর্থতার জন্য নিজেকে দায়ী করে
  •  এরা প্রতিনিয়ত নতুন কিছু না কিছু শিখে

তাহলে আপনি কোন মাইন্ডসেটের অধিকারী? 

যদি গ্রোথ মাইন্ডসেটের অধিকারী হোন তবে বেশ ভালো। এটি সবদিক থেকেই লাভবান। 

আর যদি আপনি ফিক্সড মাইন্ডসেটের অধিকারী হোন তবে কিভাবে গ্রোথ মাইন্ডসেট তৈরি করবেন?চলুন এক্ষেত্রে কিছু হ্যাক্স জানা যাক। 

হ্যাক্স-১ঃ ফোকাস রেজাল্ট       আপনি যখন রেজাল্ট বা আউটপুট চিন্তা করে কাজ করবেন তখন আপনার চ্যালেঞ্জ নিতে বা নতুন কিছু শিখতে ইচ্ছা হবে। উদাহরণস্বরূপ,  মানুষকে কিছু শেখানোর ইচ্ছা থেকে আমার ব্লগ লেখার যাত্রা শুরু। এইজন্য প্রতিনিয়ত আমাকে কিছু না কিছু শিখতে হয়।

হ্যাক্স-২ঃ টেক চ্যালেঞ্জ  জীবনে ভিন্ন কিছু পেতে হলে অবশ্যই চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। ধরুন আপনি একটি ট্রেনিং প্রোগ্রাম করলেন এবং ট্রেনিং এর শেষে ফিডব্যাক প্রদানের জন্য আপনাকে একটি ভিড়িও বানাতে বলা হলো। এই চ্যালেঞ্জ নেয়ার মাধ্যেমে আপনি যেমন ফিডব্যাক দিচ্ছেন তার সাথে সাথে আপনি আপনার ভিডিও মেকিং এবং স্পিকিং স্কিল উন্নত করছেন।

হ্যাক্স-৩ঃ এভোয়েড় মাল্টিটাস্কিং এই যুগের আমাদের তরুণ সমাজের এক সমস্যা হলো মাল্টিটাস্ক করা। ধরুণ,  আপনি প্রায় ফেসবুক স্ক্রোলিং করতে করতে বিকেলের নাস্তা খেয়ে থাকেন। এই ক্ষেত্রে না আপনার নাস্তা খাওয়া পরিপূর্ণ হয় না নিউজফিডের পোস্টগুলো আপনি মনযোগ দিয়ে পড়েন। তাই আজকে থেকে মাল্টিটাস্ক পরিহার করার চেষ্টা করুন। ফোকাস দিয়ে যেকোন একটি কাজ করুন। 

হ্যাক্সঃ৪ ডু ইন্সট্যান্টলি  আমরা অনেকেই অনেক সময় অনেক কিছু করবো বলে চিন্তা করি। আজকে, কালকে বলে সে কাজ আর করা হয় না। উদাহরণস্বরূপ, আপনি আপনার কোন বন্ধুকে ফোন দেয়ার কথা ভাবছেন। ভাবতে ভাবতে আর কল দেয়াই হলো না। এক্ষেত্রে কোন কাজ মাথায় এলে ৩ সেকেন্ডের মধ্যে সেটি করে ফেলার চেষ্টা আজকে থেকে শুরু করুন। 

হ্যাক্সঃ৫ সেট টার্গেট   চিন্তা করে দেখুন তো আপনার লাস্ট প্রেজেন্টেশন এর কথা। আপনাকে সেদিন কত প্রাক্টিস করতে হয়েছিল, টাইমিং খেয়াল রাখতে হয়েছিল, গ্রুপ মেম্বারদের সাথে যোগাযোগ করতে হয়েছিল। আর এইসব কাজ সম্ভব হয়েছিল কারণ আপনার “প্রেজেন্টেশন” নামক একটি টার্গেট ছিল। বলা হয়ে থাকে সঠিক পরিকল্পনা কাজের অর্ধেক। তাই আজকে থেকে কাজ করার আগে টার্গেট সেট করুন। 

হ্যাক্সঃ৬ স্টার্ট স্মল  বলা হয়ে থাকে- শুরু করতে হয় ছোট করে এবং আস্তে আস্তে বড় হতে হয়। রিসার্চের মতে, প্রত্যেক দিন ১% পরিবর্তন করে আপনি প্রায় ৩৭% পরিবর্তন আনতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, একদিনে ১০ কেজি কমানোর চাইতে প্রত্যেক দিন ৫০০ গ্রাম কমানোর চেষ্টা করুন। 

 আরেকটি উদারহরণ দেয়া যেতে পারে, সেটি হলো প্রত্যেক দিন ১-২ পৃষ্টা বই পড়ুন বা লেখালেখি করুন। একদিনে পুরো বই পড়া/লেখার চাইতে।  

আপনার “গ্রোথ মাইন্ডসেট” তৈরির যাত্রা শুরু হোক আজকে থেকে। আপনার জন্য অসংখ্য শুভেচ্ছা এবং শুভ কামনা রেখে আজকের ব্লগ এখানেই শেষ করলাম। দেরী না করে এখনই হ্যাক্স গুলো আস্তে আস্তে কাজে লাগান। আজকে থেকে চেষ্টা শুরু করলেন মানে আপনি ১% এগিয়ে গেলেন।  

কেমন লাগলো এই ব্লগটি এবং নেক্সট আর্টিকেল কি নিয়ে দেখতে চান? কমেন্টে আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করবেন।

ধন্যবাদ ❤

ALSO READ  সারেং বৌ:অন্তহীন সংগ্রামী এক সাহসী নারীর আখ্যান
What’s your Reaction?
+1
+1
9
+1
+1
+1
17
+1
+1
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
1
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x