Speak the truth
Skip to toolbar

ডান পা

সকালে ঘুম ভাঙল কাকের আওয়াজে। না না, আমার অ্যালাম নয়, জানালার বাইরে কাকটা বসে মন দিয়ে সুর ভাজছিল। বুঝতে পেরেছিলাম যে আজ কিছু ভালো হবে। কাকটা যেন তার গানের মধ্য দিয়ে আমাকে বলছিল, “ঘুমিয়ে থাক আজকে, না হলে…।” আজকালকার যুগে অবশ্য কে কার কথা শোনে, আমিও তাই ওর সতর্কবাণী শুনিনি তখন। আমার জন্য তবে এটা নতুন কিছু না। খারাপ পেট আর খারাপ দিন হল আমার জীবনের দুই মূল্যবান সাথী। একটা পেট খালি করে তো অন্যটা পকেট। তবে আজকের দিনটা যে সত্যিই খারাপ তাতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই কারন আর ঠিক কিছু ঘন্টার মধ্যে একদল হুলো আসবে আমার গলা টিপে টাকা বারকরে নিতে। দোষ অবশ্য আমারই, কাল রাতে কি ভেবে যে বাজি ধরেছিলাম কে জানে?  তবে আমিও বা কিকরে জানবো যে ওইরকম একটা রাবন-গুষ্টী নিয়েও ব্যাঙ্গালোর হারবে। IPL যে এভাবে আমার জীবন নিয়ে জুয়া খেলে দেবে তা স্বপ্নেও ভাবিনি। সে কী হাসি সৌনকের, শালা বলে, “ দেখ!, টিম ভালো হলে শুধু হয় না টিম স্পিরিট থাকতে হয়।“ আর ওই ঊদ্দাটা, সে তো খিক খিক করে হেসে বলে, “আমি তো ডবল খাবো।“ শালা ডবল খাবে? ইয়ের বিয়ে তোমার? এত টাকার খাবার আমি আমার গার্লফ্রেন্ডকেও খাওয়াই নি, আর তুমি হলে হুলো। মাসের মাঝখান আর পকেটে মাত্র ৪৯৬ টাকা। এখন যদি কিছু না করি, বাকি মাস কিছু না খেয়ে থাকতে হবে।

মাথায় এলো একটা উত্তাল প্লান। আমাদের বাড়ি থেকে ঠিক কিছুটা দুরেই বসেছে মেলা। হুলোগুলো আসার আগেই বেরিয়ে পড়ব। তারপর ফোন বন্ধ, কোন কথা নয়। মেলার ভিড়ে মিলিয়ে যেতে হবে, তারপর রাত করে ঘরে ফিরে আসা যাবে। আপনারা হয়ত ভাবছেন যে প্লানটার মধ্যে উত্তাল কি, কিছুনা, তৎক্ষণাৎ আর কিছু মাথায় আসেনি। আজকে বেঁচে যাই, কালকের জন্য অন্য কোন কিছু ভাববো। হুলোগুলোর আসার কথা ৬ টা তে  তাই  ৫টা নাগাদ  “জয় গুরু!” বলে বেরিয়ে পড়লাম। মেলাটা   প্রতিবছর বসে আমাদের ঠিক পাশের পাড়ার খেলার মাঠে। মনে পড়ে ছোটবেলায় বাবার সাথে আসতাম এই মেলাতে। খেলনা কিনে বাবার পকেট খালি করাই ছিল তখন আমার sole purpose। তবে এই পাড়ার সাথে আমার পরিচয় শুধু মেলা দিয়ে নয়। এই পাড়া ছিল আমাদের ছোটোবেলার আড্ডাখানা, ওই মাঠেই প্রতি বিকেলে বসতো ক্রিকেটের আসর। তবে আজকাল আর এদিকে বেশি আসা হয়না। হেঁটে যত এগিয়ে যাচ্ছি তত বুঝতে পারছি পরিবর্তনের ঝড় প্রবল বেগে বয়েছে এখানে। চোখে পড়ল রাস্তার ধারে একটা সাদা বাড়ি। বাড়িটা এখন প্রায় একই আছে। এই বাড়িতেই একসময় আমি আর কয়েকজন মিলে বাইরের “To let or sell” এর পোস্টার কে “ Toilet for sell” করে দিয়েছিলাম। যাই হোক দেখে মনে হচ্ছে বাড়িটা তাও বিক্রি হয়েছে। রাস্তার ধারে সেই বটগাছ আজ উচ্চতাতে আধা হয়েছে, তবুও ওটা পাড়ার সবচেয়ে বড়ো গাছ। কিছুদুর এগিয়েই নজরে পড়ল সেই মেয়েদের স্কুলটা যার বাইরে দাড়িয়ে কতো যে… যাই হোক। স্কুলটা একই আছে শুধু গায়ে এখন নীল-সাদা চাদর জড়ানো। পরিবর্তনের ঝড় অনেক কিছুই পালটে দিলেও আলকাতরা দিয়ে কলঙ্কাকারে লেখা “ঝোড়ো-কাক” (আমি লিখিনি, সত্যকথা) আর তারপাশে একটা উদ্ভট কাক-চিত্র (এটা আমার আঁকা,সত্যকথা) আজও আমাদের অঙ্কের মাস্টার  মান্নাবাবুর ঘরের দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে।মনে পড়ে গেল স্কুল থেকে ফেরার পথে এই মান্নাবাবুর বাড়ির সামনে এলেই কিভাবে আমরা কাকে রূপান্তরিত হতাম আর গলা ছেড়ে গান ধরতাম, “কা…কা…কা”। আহা!সেসব দিনের কথা ভেবেই যেন গর্বে বুক ফুলে এল। একসময় এই কর্কট রোগে আক্রান্ত রাস্তা, জর্জরিত চপের দোকান, সোম-বুধ-শুক্র অঙ্কের টিউশনের মধ্যেই গড়ে উঠেছিল আমাদের ছোটোবেলার ইডেন গার্ডেন। খুব তিব্রবেগে পেছনে ফেলে দিয়েছি সেই সময়গুলোকে। এতোটাই তীব্র যে ধীর গতির এই বিবর্তনও যেন আমার আচমকা বিপর্যয় বলে মনে হল প্রথমে।

Emotion-এর ঘোর কাটিয়ে উঠলে লক্ষ্য করলাম যে মেলার প্রবেশপথ এসেগেছে। নানা রঙের বাতি দিয়ে সাজানো বেশ বড়ো প্রবেশ-পথটা। সেই পথ দিয়ে অনবরত লোক ঢুকছে খুব বিপুল পরিমানে। পথের ডানদিকে Doraemon-এর একখানা মূর্তি (জানিনা কি দিয়ে বানানো) প্রবেশপথটির শোভা বাড়াচ্ছে। আর ঠিক উল্টোদিকেই ছোটা-ভীমের একটা বিকট মূর্তি সেই বাড়ন্ত শোভাকে সমগতিতে হ্রাস করে একটা

ALSO READ  A murderous thirst

সাম্যাবস্থা সৃষ্টি করে রয়েছে। কারিগরের চিন্তাভাবনার তারিফ নাকরে পারলাম না  ভিড় দেখে বুঝলাম প্রবেশ-হার আর গমন-হারের মধ্যে ব্যবধান অনেক বেশী। সেই ভিড় মোচাকে মৌমাছিদল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দাঙ্গাতে মানুষদল সবাইকে হার মানায়। প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকতে গিয়ে দাড়িয়ে গেলাম। মা রোজ বলতো যখনি কোথাও ঢুকবি বা বেরোবি সবসময় ডান পা আগে ফেলবি। মনে আছে IPL-র দিন বাম পা ফেলে টিভি-রুমে ঢুকেছিলাম, তার জন্য অনেক ভুগছি। আজ ঘর থেকে বেরনোর সময়ও ডান পা ফেলেছি। তাই এখানেও রিস্ক নেবোনা। ডান পা ফেলে ডুকে পড়লাম। ঢুকে দেখি মেলার জাঁকজমক দেখার মতো। ছোটোবেলাতে যখন শেষ এখানে এসেছিলাম, তখন এত দোকান ছিলনা। মেলাটার একটা দিকে পরপর সারি দিয়ে খাবারের দোকান। ফাস্টফুড থেকে শুরু করে ভাত-ডাল-রুটি কোনোকিছুর অভাব নেই। আর অন্যদিকে খেলনার দোকানগুলি ছোটো ছোটো বাচ্চাদের আকর্ষণ করে বাবা-মায়ের পকেট খালি করার জন্য ফাঁদ পেতে বসে আছে। তবে মেলার প্রান আজও সেই বড়ো চড়ক, বাচ্চাদের খেলনা ট্রেন আর Merry Go round । আমার এসবে কাজ নেই, আমি শুধু টাইমপাস করার জন্য মেলার দোকান গুলিতে ঘুরতে লাগলাম। একটা দোকানে চিত্রপ্রদর্শনি চলছিল।  সময় কাটানোর ভালো জায়গা আর কেনাকাটারও কিছু নেই। তাই ডান পা ফেলে দোকানটিতে ঢুকে পড়লাম । ওখানে নাকি জেলার বিভিন্ন চিত্রশিল্পিরা তাদের “ Master Piece “ পাঠিয়েছে। ছবির ব্যাপারে জ্ঞান বা উৎসাহ কোনটাই নেই আমার। তাই কেউ কোনোকিছুকে “দারুণ” বললে আমার মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই, সে একটা নগ্নমেয়ে ঘোড়ার ওপরে বসে আছে তার ছবি হলেও।

এইসময় মনে হল কেউ যেন আমার জামা ধরে টানছে। পেছনে ফিরে দেখি একটি  ছোট্ট বেশ মিষ্টি দেখতে মেয়ে, বড়ো বড়ো চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বয়স হবে পাঁচ-ছয়ের এর মতো। পরনে লাল রঙ্গের ফ্রক আর খোলা লম্বা চুল তার কোমর অব্দি ঝুলে আছে।

মেয়েটি তার আধো-আধো কথায় বলল, “ আ-আমি বাবার কাছে যাবো,কাকু ,আমাকে বাবার কাছে নিয়ে চলো।” বুঝতে অসুবিধে হল না যে বাচ্চাটি মেলাতে এসে বাবা-মার কাছ থেকে আলাদা হয়ে গেছে। আর এই বয়সে আমাকে কাকু বলছে, হে ভগবান।

“ নাম কি তোমার? বাবা কোথায়?” জিজ্ঞাসা করলাম।

মেয়েটি উত্তর দিল,”আমার নাম তিতি। বা-বাবা দোকানে আছে।

“ বাবার নাম কী তোমার, তিতি?”- জিজ্ঞাসা করলাম।

মেয়েটি নিষ্পাপ মনে উত্তর দিল, “বাবা”।

আমি আর মায়ের নাম জিজ্ঞাসা করলাম না। মেয়েটি ঠিক আমার কাকুর মেয়ের মতো, বয়সও হয়ত একই হতো আর মজার ব্যপার সেও কোনো কারনে আমাকে কাকু বলে ডাকতো। যাইহোক, এরকম পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ভালো উপায় মনে হল মেলার পরিসেবা কেন্দ্রে গিয়ে মেয়েটির নাম মাইকে বলা করানো। একজন ভদ্রলোককে জিজ্ঞসা করে জানতে পারলাম, দুর্ভাগ্যবশত অতো বড়ো মেলাতে কোন সেরকম ব্যবস্থা নেই, তবে দুরের কোন একটা লটারির দোকানে নাকি মাইকের ব্যবস্থা আছে, ওখানে গেলে কিছু হতে পারে। বাচ্চাটিকে খানে একা ফেলার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। অতঃপর “চলো,দেখি তোমার বাবা কোথায়।“- বলে আমি তিতির হাত ধরে চিত্রপ্রদর্শনী থেকে বেরিয়ে এলাম (অবশ্যই ডান পা আগে ফেলে)। বাইরেই ডানদিকে কতোগুলো খেলনার দোকান। ওর বাবা ওই দিকে থাকতে পারে বলে মনে হল। তিতিকে নিয়ে আমি দোকানগুলোর দিকে এগিয়ে গেলাম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম- “ মনে আছে কোন দিকে ছিল তোমার বাবা?” মেয়েটি কোনো উত্তর দিলনা। ভয় পাচ্ছিল হয়ত। আমার হাতটাও শক্ত কোড়ে ধরে ছিল। হঠাত তিতি দাড়িয়ে পড়ল।

“ কি হল? বাবাকে দেখতে পেলে?” জিজ্ঞসা করলাম।

“কাকু আমার ওই বাঘটা চাই”- তিতির নজর সামনের খেলনা দোকানে রাখা একটা বাঘের পুতুলের দিকে। আরে বাপরে! এখন আবার বাঘ।এখন বাঘের পুতুল মনে মিনিমাম ১০০ টাকার ধাক্কা।

“বাঘে কি করবে? বাবাকে পাই তোমার তখন কিনবে।“ – আমি বোঝানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু তা মনে হয় সফল হলোনা।

ALSO READ  বর্ণবৈষম্য

বাচ্চাটি এরপর কাঁদতে শুরু করলো, আর বেশ বায়নার সুরে বলতে লাগলো,”আমার বাঘ চাই”

আমি পড়লাম বিপদে, এই ছোট বাচ্চাদের সামলানো সবচেয়ে বিপদের কাজ। তার ওপর আবার  আশেপাশের লোকেরা আবার ভাবছে “কি নিষ্ঠুর বাবা, মেয়েকে একটা পুতুল দেয় না।”  শেষে আমাকে হার মানতে হল।

“ চলো চলো পুতুল নেবে।কেঁদনা আর।“ বলে তিতিকে নিয়ে দোকানে গেলাম। তবে দোকানে ওই পুতুলের দাম শুনে আমার বুক আর পকেট কেঁদে উঠলো। ওই ছোট পুতুলের দাম নাকি ২০০ টাকা। তিতিতো পুতুল নিয়ে খেলাও শুরু করে দিলো। অন্যদিকে আমার টাকা দেওয়ার সময় কোন জানি মনে হলো আমার পকেট আমার হাত ধরে চিৎকার করছে, “না না আমাকে খালি করে দিস না!” কিন্তু বুকে পাথর রেখে পকেট খালি করতেই হল। এত টুকুই প্রার্থনা করলাম যে ওর বাবাকে পাওয়া গেলে যাতে টাকাটি ফেরৎ পাই। এরপর আমি আর কোনো  chance না নিয়ে ওকে নিয়ে ওই লটারির দোকানের দিকে এগিয়ে গেলাম। দোকানটি Food corner- এর পাশে। রাস্তায় হাটতে হাটতে  তিতিতো বিশাল খুশি, সারাক্ষন বাঘটিকে নিয়ে খেলছে আর আমি পকেটে কত বেঁচে আছে গুনছি। এতক্ষনে ও আবার বাঘের নাম ও রেখেছে।

“কাকু…কাকু জোজো তোমাকে কামড়াবে বলছে।“- তিতি হেসে উঠলো।

“হে হে! ওর দাঁত ভেঙে যাবে।“- আমি বললাম। তিতি হেসে উঠলো। আর কিছু দূরেই ওই লতারির দোকানটি। অমনি তিতি আবার জামা ধরে টান দিলো। “কাকু আমার খিদে পেয়েছে”। যেই ভাবলাম destination এ পৌঁছে গেছি সেই আবার বিঘ্ন। আমার পকেটে আবার ব্যথা। কিন্তু কোনো উপায় নেই, বাচ্চাকে না বলাও যায় না। কি খাবে জিজ্ঞাসা করতে তিতি চেঁচিয়ে উত্ত্র দিলো “ চাউমিন”।  আমি তিতিকে নিয়ে পাশের একটা ফাস্টফুড এর দোকানে গেলাম। দেখি মেয়েটি সপাসপ করে পুরো প্লেট চাউমিন শেষ করে দিলো। মেয়েটির সত্যি খুব খিদে পেয়েছিল মনে হল। “কেমন ছিল?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম। তিতি মুখ বাঁকিয়ে বললো, “মা গো! কতো তেল দেয় এরা।“ আমি হেসে উঠলাম। দোকানের মালিকের খারাপ লাগলেও তিতির তাতে জায়-আসেনা কিছু। আমার কাকুর মেয়েও এরকম ছিল, প্রচুর বকবক করত। ওর বোকাবোকা কথা শুনে হাসিও পেতে খুব। সব বাচ্চারাই একটু হয়ত এরকম হয়। আমি টাকা দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এসে দেখি পকেটে আর ১১৯ টাকা বাকি। মাথায় খেয়াল এল, আমার ভাগ্য সত্যি কোনো কিছু ভালো করতে পারবে না, ডান পা বাম পা সব মোহমায়া। আমি আর তিতি ওই লটারির দোকানের দিকে এগিয়ে গেলাম। ওখানে মাইকে প্রচার শুরু হয়েছে। “আসুন আসুন  খাবার-বক্সের সাথে একটি লটারি টিকিট ফ্রী। প্রথম প্রাইজ ১০,০০০ টাকা!!” এই লটারির স্কিমটা বেশ নতুন মনে হল, সাথে সাথে আকর্ষণীয়। তখনি আবার আমার জামায় টান, “কাকু, আমার লটারী চাই, মিল-বক্স চাই”। “আবার? এই  চাউমিন খেলে।“ “ না আমার চাই”।তিতির আবার সেই কাঁদো স্বর। “বাচ্চাদের সত্যই ডিমান্ডের শেষ নেই,তাও অতো টাকা যখন গেছেই তখন আর কি।“- ভাবলাম। ওর বাবা এলে হিসেবটা বুঝে নেব। “যাও। নিয়ে নাও” তিতি দৌড়ে গেল লটারি ওয়ালার কাছে। একটা মিল-বক্স কিনে নিয়ে এল আর তার সাথে লটারির টিকিট। লটারির টিকিটটা আমার হাতে দিয়ে ও খেতে শুরু করলো। লটারির

নম্বরটা দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ। নম্বর হল ১৩ ৪২০। ভগবানও আজ আমার সাথে পরিহাসের মুডে আছে বলে বুঝতে পারলাম। তিতি তখন ওর খাবার প্যাকেটে হাম্লে পরেছে। এইটুকু বাচ্চা কতো খায় ভাবলেই অবাক হতে হয়।

“এই দাঁড়া!!“ একটা বেশ বিকট চিৎকারে আমি ভয় মকে উঠলাম। “ শালি!!আবার এখানে চুরি করতে এসেছিস!তোকে দেখাচ্ছি!”- বলে একটা হাবিলদার কোথা থেকে ছুটে এসে তিতির হাতটি ধরলো। তিতি চেঁচিয়ে উঠল আর ওর হাত থেকে খাবারের প্যাকেটটি পোড়ে গেলো।

“ কি করছেন আপনি।“ আমি আওয়াজ দিলাম।

“ মশাই, আপনারা পারেন বটে, চেনা-জানা নেই এসবে জান কেন? পরে আমাদের কাছে নালিশ করতে আসেন।“ হাবিলাদার আবার হাঁক দিল। আমি তখনও হতভম্ভ। এই সময় হঠাত করে তিতি হাবিলদারের হাত ছাড়িয়ে দৌড় দিল। আমি ডাকলাম,“ আরে কোথায় যাচ্ছ??” হাবিলাদারটা কিছুদুর ওর পেছনে দৌড়ে আর পারলনা, তিতি দেখতে দেখতে ভিড়ের মাঝে হারিয়ে গেল।

ALSO READ  ঋণশোধ

হাবিলাদার ফিরে এসে বলল, “ কি দাদা? কতোর লুট হল?“

আমি তখনও ক্লু-লেস,-“মানে?”

“আরে। এই মেয়েটা একটা বিশাল চোর, থাকে ওই পাশের বস্তিতে। মেলার দিনে আপনাদের মতো ভদ্রলোকেদের বোকা বানিয়ে এরকম লুট করে।“- হাবিলদার মশাই বলতে রইলেন, “ পরে আবার আমাদের কাছেই নালিশ আনবেন…ছারুন ওকে আর পাওয়া যাবে না।“ হাবিলদার গজগজ করতে করতে চলে গেল। গোটা ঘটনাটা এতো তাড়াতড়ি হয়ে গেল যে আমি ভাবার সময়ও পেলাম না কি হল। এভাবে বোকা হলাম ভেবে খারাপ লাগছিল বটে, তারপরে আবার টাকা শেষ। তখন পাশ থেকে একজন আওয়াজ দিলো,” বাবু!” ঘুরে দেখি একটা ফেরিওয়ালা। ও দাড়িয়ে দাড়িয়ে মনে হয় ঘটনাটা দেখছিল। “ বাবু, ভুল ভাববেন না আমি সব দেখলাম কি হোল। ও মেয়ে আমাদের বস্তিতে থাকে।“- ফেরিওয়ালা বলল।

“চেনেন ওকে আপনি?”- আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

“ও চুরি করে বটে, তবে সাধে করে না। মা-বাবা বলে কেউ নাই মেয়েটার। ও মেয়ে নোংরা প্লাস্টিক কুড়িয়ে নিজের খাবার জোটায়,বাবু। বহুদিন ধরে ওই নোংরা ট্রাকগুলার জন্য ওর কাজের অভাব হচ্ছে। দুবেলা খেতে পায় না মেয়েটা। কালকে খাবার চুরিতে ধরা পড়ায় হাবিলদার কি মার মারল ওকে।“

“ অবশ্য মারবেক নাই বা কেন? লোক কাজ করে পয়সা কামায়, অন্যকে দিবেক কেন? কিন্তু খিদাকে কিভাবে সামলাবে ওই বাচ্চামেয়ে, বাবু, রাগ করবেন নাই ও মেয়ের অপর, ওর ভাগ্য শুধু এখানের আর-পাঁচজন বাচ্চার মতো নয়।”- ফেরিওয়ালা চোখ মুছতে মুছতে এগিয়ে গেল ভিড়ের দিকে। আমার নজর পড়ল নিচে পড়ে থাকা ওই খাবারের প্যাকেটের দিকে।

কি ভাবছেন? আমি, ছোট্ট গল্পের ছোট্ট নায়ক, ছুটে যাবো ওই হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে খুজতে ওই বাচ্চাটিকে। তার মুখে খাবার তুলে দিয়ে বলবো, “চিন্তা নেই আমি আছি।“ হাসালেন বটে। ক্ষমা করবেন, আমি ওসব নায়ক-টায়ক কিছু না, আমি আপনাদেরি একজ্ন। আমার কাছেও দেশভক্তি মানে ক্রিকেট মাঠে ভারতকে support করা আর ভালবাসা মানে পার্কে হাতে হাত রেখে ঘোরা। আর সমাজসেবা, সে তো ওই বাৎসরিক রক্তদান আর দু-একটা ভিখিরিকে টাকা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর সমাজের ওই অন্ধকারদিক, যেখানে তিতির মতো বাচ্চাদের একবার খাবার জন্য চুরি করতে হয়, তা আমার কাছেও আলোচনার বিষয় হলেও, কর্মক্ষেত্র নয়। আমিও আপনাদের মতো মেলাতে আসি বৃহত্তর ওই হাসিমুখগুলির জন্য, নাকি ওই সংখ্যালঘুদের যাদের হাসি ফোটে একবার খাবার পেলে। আজ হয়তো আমার কাকার মেয়েও ওই তিতির খেলার সাথী, আজ ১ বছর হয়ে গেল স্টেশন থেকে তার নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার। হয়ত সেও আজ কোন মেলাতে কাউকে বোকা বানাচ্ছে। সত্যই তিতি পুরো আমার আমার কাকার মেয়ের মতো।

বাহিরপ্থটা সামনেই ছিলও, আমি মেলা থেকে বেরিয়ে এলাম। পকেটে বাকি ৬৯ টাকা আর ওই লটারির টিকিট। টিকিটটা ডাস্টবিনে ফেলে আমি এগোতে থাকলাম ঘরের দিকে। চাঁদটা বেশ পরিস্কারভাবে দেখা যাচ্ছে আকাশে, রাত অনেকটাই হয়েছে। হয়তো হুলোগুলো এখন আমার জন্য ঘরে অপেক্ষা করে আছে, কে জানে। মেলার ভেতরে তখনও ভিড়, শোনা যাচ্ছে লোকেদের কোলাহল, তারই মাঝখানে মাইকের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে হাল্কা হাল্কা,” …এবারে লটারির… পুরস্কার ঘোষণা হবে…” আমি অনেকটাই এগিয়ে  এসেছি তখন। আজকের দিনটা এখনো শেষ নয় আর এর মধ্যে এতকিছু হয়ে গেল, ভাব্লে নিজেকে আর দিন্তাকে খুব স্পেশাল মনে হল। আবার শুনলাম,”প্রথম …পুরস্কার ১৩ ৪২০।” থমকে দাড়িয়ে পড়তে হল এবার। তবে আর হাসি থামাতে পারলাম না, পাগলের মতো হাসতে হাসতে ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম।

“ আচ্ছা, মেলা থেকে বেরনোর সময় কোন পা-টা আগে ফেলেছিলাম?”

More From Author

    None Found
What’s your Reaction?
+1
+1
18
+1
1
+1
+1
8
+1
+1
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x