All is well
Skip to toolbar

ক্রুসোর ভূত

ঘরে পা রখতেই মেজাজটা গেল বিগড়ে, চেঁচিয়েডাকলাম– “নন্দুদি, ওনন্দুদি”, কাছে পিঠেই কোথাও ছিল নিশ্চয়ই, ছুটেএসেবলল, “কি হয়েছে গো?” আমি বললাম, “এসবকি? ঘরে সবকিছু উল্টোপাল্টা কেন?” টেবিলে কিছুই ঠিক জায়গায় নেই, টেবিলটা নিয়ে কেউ ধ্বস্তা ধস্তি করেছে। তাই জানালার দিকে বেঁকেআছে।নন্দুদি মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “কিন্তু আমিতো কিছু………।” মাথাটা হঠাৎকরে গরম হয়ে যাওয়ায় চেঁচিয়ে উঠলাম, “তাহলে কি ভূতে করেছে?” নন্দুদি আর কথা না বাড়িয়ে সব কিছু ঠিকঠাক করে দিয়ে চলে গেল।কলেজের ছুটি চলছে, মা চারদিন হল মাসির বাড়িতে – কারণ মাসির শরীর খারাপ। বাবা বাড়ি ফিরতে সেই ন’টা। তাই আমার সারাদিনের সঙ্গী নন্দুদিই।
সেদিন রাত্রেই অনেকক্ষন পরার পর হঠাৎকি মনে হল জেম স্টডের লেখা “অ্যানালস্ অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটি অফ রাজস্থান”- টানিয়েবসলাম।দরজারসামনেএকটা ছোট্ট চৌকিতে বসে নন্দুদি ঢুলছে, সবেমাত্র দুইকি তিন লাইন পড়েছি – হঠাৎদুদ্দাড়শব্দ।হঠাত এই বিস্ফোরক শব্দের উৎস সন্ধানে লেগে পড়লাম দুজনেই – আমি আর নন্দুদি।সময়ও লাগল না বেশীক্ষণ বইয়ের র‍্যাক থেকে প্রায় সববই-ইমাটিতেপড়েআছে।র‍্যাক সব বইগুলো রেখে নন্দুদি জিজ্ঞাসা করল “ইঁদুর, বেড়ালতো কিছুই দেখছিনা, তাহলে বইগুলো পড়ল কি করে?” আমিতো নিজেই কিছু বুঝতে পারছিনা তো ওকে বোঝাই কি করে? তবুও বললাম “এ কিছু না চল খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়ি।”
পরপর তিনদিন, ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। চারদিনের দিন পেজমার্ক লাগানো জেমস্ টডের বইটাই উধাও। বেশ মনে আছে, আগেরদিন রাত্রে পড়ে, পেজমার্ক লাগিয়ে তবে শুয়েছি। নন্দুদিকে জেরা করে জানতে পারলাম যে রাত্রিবেলা বইটা দেখে থাকলেও আজ সকাল থেকে ও বইটা দেখেনি। হতাশ হয়ে বসে আছি হঠাৎ একটা বই যেন ধপ করে টেবিলের উপর এসে পড়ল। ঠিক দেখালাম তো? নাকি চোখের বিভ্রম। ঝিম মেরে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। তারপর টাইটেল পেজটা উল্টে দেখি ড্যানিয়াল ডিফোর “রবিনসন ক্রুসো”। বইটা বেশ পুরোনো, পাতা লালচে হয়ে গেছে; কিন্তু এত পুরোনো বই তো আমার কাছে থাকার কথা নয়। নন্দুদি কে জিজ্ঞাসা করলাম, “নন্দুদি এই বইতা আবার কোত্থেকে এল গো?” প্রশ্ন শেষ হতেই বাঁহাতে বইয়ের পাতা গুলো উল্টে যেতে লাগল। আমি বলে উঠলাম, “দেখ নন্দুদি কি অবাক কান্ড, বইয়ের পাতাগুলো কেমন নিজে নিজে উল্টে যাচ্ছে।” নন্দুদি বোধকরি একটু হেসেই বলল, “উল্টে যাচ্ছে না হাতি!” সে গিয়ে ফ্যানের সুইচটা অফ করে দিয়ে বলল, “এ বার বুঝলে কেন উল্টে যাচ্ছে?” ফ্যানের গতি কমতে শুরু করল, তবে বইয়ের পাতার গতির উপর তার কোন প্রভাবই পড়ল না। সে গুলো আপনা থেকেই উল্টে যাচ্ছে, শেষে যেখানে গিয়ে থামল, সেখানে একটা নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে – “অ্যাই ফাউন্ড দ্যা প্রিন্টস অফ আ নেকেড ম্যানস কুট।”
জেমস্ টডের বইটা বইয়ের তাক আঁতিনাঁতি করে খুঁজেও পাওয়া গেল না। পরেরদিন রবিনসন ক্রুসোর পাতা ওল্টাতে গিয়ে দেখি একটা পেজমার্ক। এই পেজমার্কটাই না দুদিন আগে জেমস্ টডের বইতে লাগিয়ে উঠে গিয়েছিলাম, ভীষণ রাগ হল। রবিনসন ক্রুসোটা ছুঁড়ে ফেলে দিলাম মাটিতে। বইটা তীরবিদ্ধ পাখির মতো মাটির উপর গিয়ে পড়ল। পেজমার্কটা ছিটকে গিয়ে পড়ল একহাত দূরে। আমি উঠে গিয়ে মাটি থেকে তুলে নিলাম পেজমার্কটা। ভালো করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলাম, একটা সার্কাসের টিকিট- “দ্যা গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস।” তারিখটা অস্পষ্ট। সালটা কোনও রকমে পড়তে পারি, একান্ন বছর আগেকার টিকিট। একান্ন বছর আগেকার টিকিট, আমি তখন কোথায়? হয়তো দাদু বা বাবা গিয়েছিল। এতদিন সে টিকিট বাবা সযত্নে গুছিয়ে রেখেছে? একান্ন বছর আগে কেউ কোন বইতে পেজমার্ক লাগিয়ে ছিল? একান্ন বছর পড়ে কি তবে আমি ভুল করে খুলে ফেলেছি সেই বই?
প্রশ্নগুলো জট পাকালো আমার মাথার মধ্যে। বাবা সেদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরায় পুরো ঘটনাটা গোড়া থেকে বাবাকে গিয়ে বললাম।
পরেরদিন বাবা আমাকে নিয়ে গেলেন শিবপুরে। ট্রামডিপো ছাড়িয়ে একটা গলির মধ্যে বাড়িটা। লাল ইট বার করা পুরনো আমলের বাড়ি। দরজাই কড়া নারতেই ফিনফিনে ধুতি পাঞ্জাবী পরা এক ভদ্রলোক এসে দরজা খুললেন। নমস্কার করে বললেন, “আপনি?”
বাবা আমার পাশ থেকে বলে উঠল, “কয়েকদিন আগে আপনাদের পারিবারিক সংগ্রহ থেকে বেশ কিছু বই কিনে নিয়ে গেছি।” বাবাকে চিনতে পেরে ভদ্রলোক বললেন “আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, আসুন, আসুন, আপনার ছেলে নাকি?” পরের প্রশ্নটা এল আমার দিকে “কি বই গুলো ভালো লেগেছে তো?” তবে বই গুলো বিশেষ রবিনসন ক্রুসোটা যে কি ভালো লেগেছে তা আর বলার নয়।
ঘরে গিয়ে বসে বাবা সরাসরি জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা আপনাদের পারিবারিক সংগ্রহটা আসলে কার?
“আমার দাদুর, আমার দাদু ইংরেজীর অধ্যাপক ছিলেন, তিনি প্রচুর বই পড়তেন আর অন্যদেরও উৎসাহিত করতেন”- ভদ্রলোকটি বলেলন।
“কিন্তু আপনাকে মনে হয় খুব একটা উৎসাহিত করতে পারেননি তাহলে আপনি এত মূল্যবান সব বই বিক্রি করতেন না”- বাবা বলল।
“ঠিকই বলেছেন, আমি একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের ধর্মতলা শাখার ম্যানেজার, ওসব সাহিত্য-টাহিত্য আমার পোষায় না।”- ভদ্রলোকটি উত্তরে বললেন।
এরপর বাবা বললেন, “আপনার দাদু কি ছোটেদের বইও পড়তেন? জিজ্ঞাসা করছি কারণ আমার ছেলেটি এই বই গুলোর মধ্যে একটি রবিনসন ক্রুসো উদ্ধার করেছে তাই।”
“তাহলে বোধহয় ওটা আমার দাদার। কিন্তু সে তো পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা।”- ভদ্রলোকটি বলেলন।
তারপর ভদ্রোলোকটি উঠে গিয়ে ভেতরের ঘর থেকে একটা ফ্যামিলি অ্যালবাম নিয়ে এলেন। সেটার ভিতর থেকে একটা ছবি দেখিয়ে বললেন “এই আমার দাদা।”
ছবিটি দশ – এগারো বছরের একটি ছেলের। ছবির নীচে ছোট ছোট করে লেখা “টুবলুর এগারো বছরের জন্মদিন।” তাইতো “রবিনসন ক্রসো” বইটায় “টুবলু” নামটা প্রথম দিনই লক্ষ্য করেছি – আমি ভাবলাম। ভদ্রলোক একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললেন, “শুনেছি দাদা খুব দুরন্ত ছিল, হয়তো বইয়ের র‍্যাকে চড়তে গিয়েছিল, বই শুদ্ধ ভারী র‍্যাক পড়ল তাঁর ঘাড়ে, তাতেই মারা গেল। তারপর আমার দাদুও অবশ্য বেশিদিন বাঁচেননি। রবিনসন ক্রসো বইটা খুব প্রিয় ছিল ওর। দাদু রোজ রাতে ওকে পড়ে শোনাতেন বইটা।”
সন্ধের মুখে বাড়ি ফেরার পথে গাড়ির সিট বেল্ট টা আলগা করে বাবা বলল, “টুবলু অর্ধেকটা গল্প শুনেছিল তাঁর দাদুর মুখে – অবশ্যই বাংলাতে কারণ অত কঠিন ইংরেজি বোঝার বয়স তখনও তাঁর হয়নি, আর বাকি অর্ধেকটা শোনার জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে একান্ন বছর, ওকে আর অপেক্ষা করাস না। আজ সন্ধেবেলায় আবার বই উল্টে যাবে, খুলবে ওই একই পাতা। পড়ে শুনিয়ে দিস, কিন্তু মনে থাকে যেন অবশ্যই……।”
“বাংলাতে”- কথাটা শেষ করলাম আমি।।

ALSO READ  এসো আদিম হই

More From Author

    None Found

What’s your Reaction?
+1
26
+1
+1
4
+1
+1
+1
+1
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x