দৃশ্যপট ১

রমিজ সাহেব, উনার সাহেবা অর্থাৎ মিসেস রমিজ কে নিয়ে বের হবেন।কিন্তু কোথায়?
শপিং এ?নাকি ঘুরতে?
নাকি অন্য কোথাও?
ব্যাগ এ সবকিছু ঠিকমত নেওয়া হয়েছিল কিনা ভালো করে বারবার দেখে নিলেন মিসেস রমিজ।খুব ই দায়িত্বশীল এই মানুষটি নিজের স্বার্থের জন্য কাউকে কখনো এক চুল ও ছাড় দেন নি।খুব ই কঠোর ছিলেন।ব্যবস্থাপনার ছাত্রী মিসেস রমিজ জীবনের যে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ছিলেন খুব ই সচেতন।লাভ এর বাইরে ক্ষতির চিন্তেও কখনো করেন নি।গুণে গুনে ২ বার তিনি রমিজ সাহেবের দিকে তাকালেন।দ্বিতীয়বার রমিজ সাহেবের সাথে চোখে চোখ পড়ে যায়।কিছু বলতে গিয়েও আবার বলেন না মিসেস রমিজ।রমিজ সাহেব ও স্ত্রীর কথার উপর কথা বা তাকে শাসন করার মানসিকতায় ছিলেন না কখনো।সবসময় স্ত্রীর কথাটাকেই আগে প্রাধান্য দিয়েছেন।এটা কি ভয় নাকি ভালোবাসা তা তিনি ই জানেন।তবে যেটাই হোক,”ভ” তো আছেই।
“এই শুনছো?ছাতাটা কি নিয়েছো?”বললেন মিসেস রমিজ।রমিজ সাহেব জানালায় গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছেন।অনেক দিন হল,সুন্দর করে আকাশ দেখা হয় না।আজকের আকাশ টা সুন্দর না,আবার সুন্দর ও বটে।কালো আকাশ,মেঘে ঢাকা পুরোটাই।এখনো বৃষ্টি হয়নি,তবে হতে কতক্ষন?তাই ছাতার নেওয়ার বিষয়টি আমলে নিয়েছেন মিসেস রমিজ।একসাথে কতই না বৃষ্টিতে ভিজেছেন এই দম্পতি।আজ ও কি ভিজবেন,সেটা সময় ই বলে দেবে।এখনো সকালের নাস্তা করা হয়নি।নাস্তার টেবিলের সামনে গিয়ে ফিরে এসেছেন ২ বার।
পাউরুটি গুলা খেতে ইচ্ছে হচ্ছিল না।পাকঘরে গেলেন,একটি পাত্রে অনেকগুলা চিকেন ছিল।মাত্র একটি ছোট্ট চিকেন আস্তে করে কাগজে মুড়িয়ে পকেটে নিলেন।নিজের জন্য নয়,স্ত্রীর জন্য।এতদূরের পথ।বেচারি না খেয়ে থাকবে কি করে?
সকাল ১১ টা।
রমিজ দম্পতিরা ঘুম থেকে উঠেছিলেন ভোরে,আসলে রাতে ঘুম ই হয়নি তাদের।মিসেস রমিজ ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন এবং পরক্ষণেই রমিজ সাহেবের দিকে তাকাচ্ছেন।এভাবে অনেকক্ষন চললো।
“কি হল,তুমি নামছো না কেন?”,বললেন মিসেস রমিজ।
রমিজ সাহেবের অপেক্ষা করছেন।কিন্তু কার জন্য অপেক্ষা,কিসের জন্য অপেক্ষা?কেউ কি আসবে না কি?এটা মিসেস রমিজের বরাবরের মতই অজানা।এভাবে আরো ৩০ মিনিট কেটে গেলো।রমিজ সাহেব এর এখন বের হতেই হবে।কারণ অনেক দূরের পথ পাড়ি দিতে হবে।বের হতে চাচ্ছেন ই না তিনি।মেঘলা আকাশ তাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে।কিন্তু রমিজ সাহেবের কিসের জন্য এই অপেক্ষা?
সৃষ্টিকর্তা আর রমিজ সাহেব ছাড়া হয়তো কেউই জানেন না।রমিজ সাহেবের অপেক্ষার মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।দীর্ঘশ্বাস গুলো বেড়েই চলছে।”কি সব পাগলামি শুরু করেছো?এখনো নামছো না কেন?হলো কি তোমার?বলে চেচিয়ে উঠলেন মিসেস রমিজ।
আর অপেক্ষা করা যাচ্ছে না।সৃষ্টিকর্তা কি এতটাই নিষ্ঠুর!!
হয়তো রমিজ সাহেবের অপেক্ষা ফুরোবোর নয়।তাই উঠে দাঁড়ালেন।জানালা দিয়ে আবার ও আকাশ দেখলেন।
আকাশ তখনো মেঘলা।পুরোই শিল্পীর তুলির আচড়ে আকা এক আলপনা।
রমিজ সাহেব মিসেস রমিজ কে নিয়ে নেমে পড়লেন।

ALSO READ  প্রতুত্তর

দৃশ্যপট ২

এখন কোনো রমিজ সাহেব নয়।রমিজের গল্প।ছোট্টো রমিজ টা স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে,কলেজ শেষ করে ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে।লেখাপড়ায় বরাবর ই প্রশংসার পাত্র ছিল রমিজ।রমিজ তার বাবা মা ও দাদা দাদির সাথে একসাথেই থাকত আগারগাও তে।এ বাড়িটা অনেক আগের।রমিজের দাদা তৈরি করেছিলেন এই বাড়ি।খুবই শক্ত আর মজবুত কাঠামোর বাড়ি।অনেক পুরনো হলে কি হবে,এখন ও সম্পূর্ন আভিজাত্যের ছোয়া ই আছে এই বাড়িতে।হঠাত এক দূর্ঘটনায় রমিজের দাদা দাদি দুজন ই মারা গেলে রমিজের বাবা মাকসুদ সাহেব প্রচন্ড ভেঙ্গে পড়েন।অধিক শোকে পাগলের মত হয়ে যেতে লাগলেন,তবুও এক মাত্র ছেলে রমিজের কথা ভেবে রমিজ কে নিয়ে আর স্ত্রী শায়লা কে নিয়ে ঘুরে দাড়ান তিনি।নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে পড়াকালেই রমিজ প্রেমে পড়েন ব্যবসায় প্রশাসনের আয়েশার।মারাত্মক সুন্দরী এই মেয়েটি।দেখেই রমিজের বাবা মার পছন্দ হয়,খুব ধুমধাম করে বিয়েও দেন রমিজের সাথে।কিন্তু সুখের দিন অল্প সময়ই টিকে।তাই আয়েশার ও এই সুন্দর চেহারার পিছনে তীব্র অহংকারী মনোভাব টি প্রকাশ পেতে বেশিদিন লাগল না। অল্পদিনেই সংসারে আধিপত্য দেখাতে প্রস্তুত ছিল আয়েশা।তাই সংসারে দিনের পর দিন মাকসুদ সাহেব আর শায়লার অধিকার খর্ব হতে হতে শুন্যের কোঠায় চলে আসে।এ সংসারে এখন রাজা রানী দুজন ই আয়েশা।আর রমিজ তার অনুসারী।একে একে চার সন্তানের জনক রমিজ।এ সংসারে যেন এখন নবীনদের প্রাধান্যের ভীড়ে তিলে তিলে হারিয়ে যায় প্রবীনদের গুরুত্ব।তাই তো মাকসুদ-শায়লা দম্পতির আর জায়গা হয় না আগারগাওয়ের সেই বাড়িতে।
একদিন খুব সকালে বেরিয়ে যায় রমিজ।বাবা মার থাকার জন্য নতুন এক জায়গার সন্ধানে,যেখানে তাদের মত আরো অজস্র দম্পতি ই থাকেন,খান,ঘুমান।বাসায় এসে মাকসুদ সাহেব ও শায়লা কে জানিয়ে দেন তাদের নতুন ঘরের কথা।মাকসুদ-শায়লা দম্পতি উত্তরে বিন্দুমাত্র কিছু বলেনি পুত্র রমিজেকে।
একসময় যাবার দিন চলে আসে।পুত্র আর পুত্রবধুকে প্রাণ ভরে দোয়া করেন কিন্তু বিদায়কালের বিন্দুমাত্র আতিথেয়তা,ভালোবাসা কোনোটাই পান নি।
আকাশে মেঘের গর্জন হচ্ছিল খুব।মাকসুদ সাহেব দেখলেন প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হয়েছে,তাই প্রিয়তমা শায়লার হাত ধরেই নেমে গেলেন।পুত্রের দেওয়া ছাতাটি পুত্রের হাতেই রেখে দিলেন,নিলেন না সেটি।কিছু সময় পর অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হলে স্ত্রী শায়লা জিজ্ঞেস করল,”কেনো নামলে এ অঝোর ধারায়?”মাকসুদ সাহেব শায়লার দিকে তাকিয়ে কাঁদলেন।কিন্তু এতক্ষনের সব কান্না বৃষ্টির পানিতে মিশে একাকার।এটাই হয়তো ভালো সময় ছিল মাকসুদ সাহেবদের জন্য।কান্না লুকোবোর জন্য এর চেয়ে শ্রেয় সময় কি আর কিছু হয়?কিন্তু বৃষ্টির মাত্রা যেন বেড়েই চলছে।একসময় আর পারল না ষাটোর্ধ্ব এই দম্পতি।কিন্তু আশ্রয় নেওয়ার মত কোনো কিছুই ছিল না সেখানে।পরদিন সকালে বৃষ্টি কমে যায়।খবর আসে রমিজের বাসায়।আড়াই মাইল দূরে লাশ পড়ে আছে মাকসুদ শায়লা দম্পতির।হয়তো অধিক ঠান্ডা সহ্য করতে পারেনি এই দম্পতি।কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্তেও হাত ছাড়েনি তারা একজন আরেকজনের।
লাশ দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে রমিজ।কিন্তু তেমন কোনো ভাবোদয় ছিল না আয়শার মনে।”মানুষের গড় আয়ু ৬৪ বছর।এসময় কি মানুষকে চাইলেও কেউ ধরে রাখতে পারে?”এটুকু বলেই নিজের দায়িত্ব শেষ করে চলে যায় আয়েশা।লাশ দাফন করে আসে রমিজ।বাসায় এসে দেখে চার সন্তান চেয়ে আছে রমিজের দিকে।
না,এভাবে আর ভেঙ্গে পড়লে চলবে না।স্ত্রী আয়েশা সহ ৫ টি মুখের দিকে তাকিয়েই ঘুরে দাড়াতে হবে তাকে।
মাকসুদ সাহেব আর শায়লার স্মৃতিগুলো দূরে চলে যায় ধীরে ধীরে।

ALSO READ  কিভাবে জটিল অবস্থায় নিজেকে ডেভলপ করবেন?

দৃশ্যপট ৩

পৃথিবীতে ল অফ ন্যাচারাল রিটার্ন বলতে একটা কথা আছে।সবকিছুই আপনা আপনি ই ব্যালেন্স হয়ে যায়।এটা হয়তো সৃষ্টিকর্তার এক অনন্য খেলা।রমিজ সাহেবের মনে পড়ে গেলো,তার বাবা মাকসুদ সাহেব যেদিন এভাবে স্ত্রী শায়লার হাত ধরে নেমে যাচ্ছিলেন,সেদিন প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিল।এমনকি বৃষ্টির পানিতেই তো ঠান্ডা লেগে চিরতরে চলে যেতে হয়েছিল তাদের।সেদিন বৃষ্টির পানিতে মিশে গিয়েছিল তার বাবা মা এর চোখের পানি।কিন্তু একটিবারের জন্য ও সেটি উপলব্ধি করতে পারেন নি সেটা রমিজ সাহেব।আজ জীবনের এই হৃদয়বিদারক মুহূর্তে এসে সেদিনের সবকিছু ফ্লাশব্যাকের মত মনে পড়ছে রমিজ সাহেবের।আজ ও আকাশ মেঘলা।কিন্তু আজ কোনো বৃষ্টি নেই।কান্না লুকাতে পারেন না এই তিনি।আর সামান্য বাধ ভেঙ্গে গেলে হয়তো চোখের পানি ই রূপ নেবে প্লাবনের।মাকসুদ সাহেব আর শায়লার চিরবিদায়ের পর থেকে অনেকটাই শুধরে গিয়েছিল আয়েশা।ধীরে ধীরে চার সন্তান কেই বিয়ে দেন রমিজ-আয়েশা।সবার ঘরেই নাতি নাতনির দেখাও পেয়ে যান।কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ মাকসুদ সাহেব এর জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে রমিজ আর শায়লার স্থলে আয়েশা।নতুন কোনো জায়গার সন্ধানে নামতে হচ্ছে আজ তাদের।খুব আপন মানুষ গুলাই একসময় আর আপন থাকে না।
এগুলা ভেবে ২ জনেই অনেকক্ষন চুপ করে রইলেন।
ঘনঘন কয়েকবার রমিজ সাহেবের দিকে তাকালেন শায়লা।ক্ষিদে লেগেছে প্রচন্ড। হাটতে হাটতে চলে আসলেন উত্তরার কাছাকাছি।
আজ তাদের কোনো ঠিকানা জানা নেই।হেটেই চলেছেন অবিরত।
কি যেনো ভেবে একটু পরই ব্যাগের ভেতর হাত দিয়ে ছোট্টো একটু মুরগির মাংস বের করলেন রমিজ সাহেব।”আয়েশা,তোমার জন্য লুকিয়ে এনেছি এটা।নাও,খেয়ে নাও।”স্বামীর চোখের দিকে একটিবারের জন্য তাকালেন আয়েশা।
এবার আর কান্না আটকানো গেলো না।
বৃষ্টির জন্যেও আর অপেক্ষা করা গেলো না।
প্রকৃতি অনেক নিষ্ঠুর।
সে আপনাকে ঠিক ততোটাই দিবে,যতটুকু আপনি করেছেন।
বৃষ্টির অপেক্ষার চেয়ে যেন চিরবিদায়ের অপেক্ষাটাই এখন মুখ্য রমিজ সাহেব আর আয়েশার কাছে।

ALSO READ  রশিদ হারুনের শেষ কবিতা
What’s your Reaction?
+1
+1
9
+1
+1
+1
18
+1
+1
2
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x