Believe you can
Skip to toolbar

যদ্যপি আমার গুরু:গুরুর প্রতি স্মৃতিচারণের অমর এক বয়ান

বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী লেখাগুলোর দিকে চোখ পড়লেই দেখা যায় সেখানে অনেক অনেক উপন্যাস কিংবা ছোটগল্প বা কবিতা,নাটকে পূর্ণ।প্রবন্ধগ্রন্থ ও পাওয়া যাবে হয়তো অনেক কিন্তু গুরুর প্রতি স্মৃতিচারণ করে বাংলা সাহিত্যে সাহসী ও অসামান্য লেখা খুব একটা পাওয়া যায় না বললেই চলে।একজন আদর্শ শিক্ষকের ঘটনাবলী প্রকাশ করার জন্য ছাত্রকেও যে আদর্শ হতে হয়,সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।এরকম একটি দু:সাধ্য কাজকে সাধন করার সাহস ই দেখিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত লেখক,কবি,প্রাবন্ধিক,চিন্তাবিদ আহমদ ছফা।একজন জ্ঞানী শিক্ষকের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য হয়েছিল ছফা সাহেবের।সেই গুরুর সান্নিধ্যে লেখক জ্ঞানের যে তৃষ্ণা উপলব্ধি করেছেন,সেই তৃষ্ণা আসলে মিটে যাওয়ার নয়।যত বেশি জেনেছেন,তৃষ্ণা ততো বেশি আকড়ে ধরেছে ছফা সাহেবকে।তাই একটি সময় সাহস করেই ফেললেন একটি সৃজনশীল জীবনী রচনার।যেই জীবনী বাংলা সাহিত্যে হয়ে গেলো কালজয়ী,অমর হয়ে রইলো সাহিত্যের পাতায়,যার প্রতিটি বাক্য মুগ্ধ করেছে প্রতিটি পাঠক কে,এক যাদু,মায়ার সংমিশ্রণে রচিত সেই গ্রন্থটির নাম ই হলো,”যদ্যপি আমার গুরু”।

আহমদ ছফা যা পেয়েছেন,তা পাওয়ার সৌভাগ্য অনেকের ই হয়নি বললেই চলে।তিনি যা পেয়েছেন,তা হারিয়ে যেতে দিতে চাননি।কালের গহ্বরে বিলুপ্ত হতে দিতে চান নি।তিনি তাই লিখে গেছেন একজন জ্ঞানতাপসের কথা।জ্ঞানতাপসের কথা বলতে গেলেই সক্রেটিসের নামটাই হয়তো প্রথমে চলে আসে যার জীবনে বাকি সব কাজ ছিল গৌণ,জ্ঞান নিয়ে তপস্যা টাই ছিল শুধুমাত্র মুখ্য।সক্রেটিসের সান্নিধ্যে তখন এসেছিল সেই সময়ের অগণিত তরুণ।জ্ঞানের তৃষ্ণা একবার যাকে পায়,তাকে আর ছাড়ে না।এই তৃষ্ণা বেড়েই চলে ক্রমাগত।লেখক আহমদ ছফা ও পেয়েছিলেন তেমনি এক সক্রেটিসের সান্নিধ্য।যার সংস্পর্শে এসে জ্ঞানের ভান্ডারে হাবুডুবু খেয়েছেন,কিন্তু উপলব্ধি করেছেন ঠিক ই যে সেই জ্ঞান সমস্তটা আহরণ করা সম্ভব নয়।আহমদ ছফার জীবনের সেই বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব,যাকে নিজের গুরু মেনে জীবনের প্রতিটি স্তরে,প্রতিটি পরিস্থিতিতে ছুটে গেছেন যার দ্বারে,তিনি ই জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক।১৯৯৮ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত এই জীবনী গ্রন্থটি তাঁকে নিয়েই।

১৯৭৫ সালে “জাতীয় অধ্যাপক” হিসেবে মনোনীত হওয়া আব্দুর রাজ্জাক বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী।জ্ঞানের প্রতিটি স্তরেই ছিল যার অবাধ বিচরণ ও অগাধ পান্ডিত্য।জীবনে যার মুখ্য উদ্দেশ্যই ছিল জ্ঞানার্জন।সহজ সরল জীবনযাপন করা কিংবদন্তি জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের সংস্পর্শে অজস্রবার এসেছিলেন লেখক আহমদ ছফা।গুরু হিসেবেই নিজেকে সপে দিয়েছিলেন আবদুর রাজ্জাকের জ্ঞানের সমুদ্রে।১৯৭২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত এক যুগে এমন কোনো সপ্তাহ হয়তো ছিল না যেই সপ্তাহে আবদুর রাজ্জাকের সাথে সাক্ষাত হয়নি আহমদ ছফার।তিনি বারেবারে গিয়েছেন অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের দ্বারে।জ্ঞানের পিপাসা মিটিয়েছেন ভেবেও মিটাতে পারেননি কখনো পরিপূর্ণভাবে।কারণ আব্দুর রাজ্জাকের জ্ঞানের সীমাকে ছুঁয়ে দেখা টা একরকম অসম্ভব ই ভাবলেন আহমদ ছফা।”যদ্যপি আমার গুরু” গ্রন্থটিকে মাঝে মাঝে বলা হয় আহমদ ছফার গুরুদক্ষিণা।গুরুদক্ষিণা বলতে সাধারণত বুঝানো হয় শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষককে প্রদত্ত অর্থাদি।লেখক আহমদ ছফা অর্জন করেছেন অজস্র ও সীমাহীন জ্ঞান।তার বিনিময় দেওয়া কখনোই সম্ভব নয়।কিন্তু গুরুর প্রতি ভক্তি,ভালোবাসা থেকে লিখে রেখে গেছেন সে সকল মহামূল্যবান সময়টাকে সাহিত্যের কলেবরে,করে গেছেন স্মৃতিচারণ।এরকম ভক্তি ও ভালোবাসা থেকে প্রদত্ত রচনাটিকে তাই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এক প্রকারের গুরুদক্ষিণা বলাটাও হয়তো যথার্থ।

ALSO READ  রজনী, হিমু ও কিছু কাঠগোলাপ

রচনার শুরুতে আহমদ ছফা চলে গেছেন কিছুটা পেছনের দৃশ্যপটে।এম.এ পাশ না করেই এম.এ চলাকালীন অবস্থায় পি.এইচ.ডি করতে আগ্রহী আহমদ ছফা নিজেই নিজের থিসিসের বিষয় ঠিক করলেন,”আঠারোশো থেকে আঠারোশো আটান্ন সাল পর্যন্ত বাংলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব, বিকাশ এবং বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতি এবং রাজনীতিতে তার প্রভাব”।কিন্তু প্রফেসর মুনীর চৌধুরী ছফা সাহেবকে “ভাষাতত্ত্ব” বিষয়ে পিএইচডি করার পরামর্শ দিলে তখন আর পিএইচডি করা হয়নি লেখকের।থিসিসের একজন পরামর্শক দরকার তাই তিনি দ্বারস্থ হলেন জাতীয় অধাপক আবদুর রাজ্জাকের।জনাব আবদুর রাজ্জাক খুব সাধারণ ও সহজ সরল জীবনযাপন করতেন।ফলহীন গাছ যেমন ফলের ভারে নুয়ে থাকে,প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক ও তার অসীম পান্ডিত্য কখনো নিজের বৈশিষ্ট্যে প্রকাশ করেননি।এভাবেই আহমদ ছফার সৌভাগ্য হয় এই জ্ঞানতাপসের সংস্পর্শে আসার।প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক ছিলেন বহু গুণের অধিকারী।শিক্ষা,রাষ্ট্রবিজ্ঞান,অর্থশাস্ত্র,সমাজবিজ্ঞান,ইতিহাস,শিল্প-সাহিত্য,ধর্ম-সংস্কৃতি সব বিষয়েই তিনি ছিলেন একজন জ্ঞানের ভান্ডার।তাঁর জ্ঞানের পরিসীমা খুব বেশি মুগ্ধ করতো ও কাছে টানতো ছফা সাহেবকে।জ্ঞানের এই আলোতে আলোকিত হওয়ার গল্পের শুরুটা এখান থেকেই।

দেশ স্বাধীনের পর অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের কাছে নিয়মিত ছুটে যেতে লাগলেন আহমেদ ছফা।প্রতিনিয়তই বিভিন্ন বিশিষ্ট ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের আগমন ঘটতো অধ্যাপকের বাসায়।আবদুর রাজ্জাক ও খুব সাধারণ ভাবেই বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতেন ছফা সাহেবের সাথে।আহমদ ছফা উপলব্ধি করতে লাগলেন যে আবদুর রাজ্জাক জীবনে কখনো তেমন লেখালেখি না করলেও তাঁর প্রতিটি উক্তি ই যেন দর্শনের অমূল্য কোনো সম্পদ,সাহিত্যের কিংবদন্তি রচনা কিংবা একজন গুরুর তার শিষ্যকে দেওয়া যথার্থ শিক্ষা।দিন যেতে লাগলো।আহমদ ছফা ও মুগ্ধ হতে লাগলেন।জনাব আবদুর রাজ্জাকের বাসায় তাঁর পান্ডিত্যের পর সবচেয়ে অমূল্য সম্পদ ছিল বিভিন্ন রকমের বইয়ের সংগ্রহ যে সংগ্রহ নিমিষেই অবাক করে দিতে পারে যে কোনো উৎকৃষ্ট পাঠককেও।রাজ্জাক সাহেবের পরামর্শেই বিভিন্ন বিখ্যাত লেখকদের বই পড়া শুরু করলেন আহমদ ছফা।থিসিস প্রস্তুত করা পিছিয়ে যেতে লাগলেও জ্ঞানের তৃষ্ণা বেড়ে যেতে লাগল।কখনো সমাজবিজ্ঞান,কখনো ইতিহাস আবার কখনো প্রয়াত কমিউনিস্ট নেতা কমরেড আবদুল হকের পূর্ব বাংলা আধা সামন্ততান্ত্রিক,আধা উপনিবেশিক বিষয়ে আলোচনা,এমনকি সাহিত্য থেকে শুরু করে যে কোনো বিষয়ে দারুণ আলোচনার জন্ম দিতেন রাজ্জাক সাহেব।বাংলা মুসলমানের সাহিত্যের বিবেচনায় কেন তিনি পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন,সেই বিষয় নিয়েও ছফা সাহেবের সাথে হতো আলোচনা।

ALSO READ  অবন্তীর বাবা দিবস - Humayara Tabassum : 4th Place Winner

আবদুর রাজ্জাকে উক্তিসমূহ ছিল অন্য বিখ্যাত ব্যাক্তিবর্গের দেওয়ায় যে কোনো উক্তিকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার মত।এরকম কিছু উক্তি হলো:

১. “একটা কথা খেয়াল রাখন খুব দরকার। যখন একটা নতুন জায়গায় যাবেন, দুইটা বিষয় পয়লা জানার চেষ্টা করবেন। অই জায়গার মানুষ কি খায় আর পড়ালেখা কী করে। কাঁচাবাজারে যাইবেন কি খায় হেইডা দেহনের লাইগ্যা। আর বইয়ের দোকানে যাইবেন পড়াশোনা কি করে হেইডা জাননের লাইগ্যা।….কী খায় আর কী পড়ে এই দুইডা জিনিস না জানলে একটা জাতির কিছু জানন যায় না।”

২. “পড়ার কাজটি অইল অন্যরকম। আপনে যখন মনে করলেন, কোনো বই পইড়্যা ফেলাইলেন, নিজেরে জিগাইবেন যে বইটা পড়ছেন, নিজের ভাষায় বইটা আবার লিখতে পারবেন কিনা। আপনার ভাষার জোর লেখকের মত শক্তিশালী না অইতে পারে, আপনের শব্দভান্ডার সামান্য অইতে পারে, তথাপি যদি মনে মনে আসল জিনিসটা রিপ্রোডিউস না করবার পারেন, ধইরা নিবেন, আপনের পড়া অয় নাই।”

৩. “যে জাতি যত সিভিলাইজড, তাঁর রান্নাবান্নাও তত বেশি সফিস্টিকেটেড। আমাগো ইস্টার্ন রান্নার সঙ্গে পশ্চিমাদের রান্নার কোন তুলনাই হয় না। অরা সভ্য অইছে কয়দিন। এই সেদিনও তারা মাছ-মাংস কাঁচা খাইত।”

সবসময় ঢাকাইয়া ভাষায় সাবলীল ভাবেই কথা বলে গেছেন দেশের এই বিখ্যাত শিক্ষাবিদ।যে কোনো শিক্ষাকে তিনি ধরিয়ে দিয়েছেন যথার্থভাবে তার শিষ্যের মস্তিষ্কের মূল জায়গাটিতে।

দেশের বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গদের সম্পর্কে জানতে আহমেদ ছফা ছুটে যেতেন আবদুর রাজ্জাক স্যারের কাছে।কখনো একা,কখনোবা সাথে কাউকে বা কাউকে নিয়ে।বিখ্যাত ব্যক্তিদের প্রশংসার পাশাপাশি প্রকৃত সমালোচনার দিক থেকেও পিছপা হতেন না মোটেও।সমালোচনা করেছেন রাজা রামমোহন রায়,বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়েও।কালোকে কালো এবং সাদাকে সাদা বলতে পারার এক অসাধারণ গুণের অধিকারী ছিলেন তিনি।চিত্রশিল্পী এস.এম.সুলতানকে যখন আহমদ ছফা জনাব আবদুর রাজ্জাকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন,চিত্রশিল্পীর জন্য যতটুকু করা যায় চেষ্টা করে গেছেন রাজ্জাক সাহেব।এমনকি আহমদ ছফার বারো বছর ধরে অনুবাদকৃত গ্রন্থ গ্যোতের ফাউস্টের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি ছফা সাহেবের জন্য চেষ্টা করে গেছেন সাধ্যমত,সাহায্য করেছেন কখনো আর্থিকভাবে,কখনো মানসিকভাবে।এতকিছুর পর আমরা নি:সন্দেহে বলতেই পারি যে আহমদ ছফা যেমনি আবদুর রাজ্জাক কে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন,ঠিক তেমনি ছফা সাহেবকেও একজন যথার্থ ও জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থী হিসেবেই মেনে নিয়েছিলেন শিক্ষকদের শিক্ষক খ্যাত জনাব আবদুর রাজ্জাক।

ALSO READ  Birth Anniversary - Kadambini Devi - A flagbearer for Indian women

শুধু দেশের গন্ডিতে নয়,জনাব আবদুর রাজ্জাক মুগ্ধ করে গেছেন হেনরি কিসিঞ্জার,হ্যারল্ড লাস্কির মত বিখ্যাত ব্যক্তিদের ও।আহমদ ছফার এই গ্রন্থটি ১৬ টি ভাগে বিভক্ত।সর্বশেষ পাঠে এলে আমরা জানতে পারি এক ঢাকাইয়া পোলা সম্পর্কে যিনি জনাব আবদুর রাজ্জাক ই।নিজের ঐতিহ্য,সংস্কৃতি,খাদ্যাভাসকে ভোলেন নি কখনোই,ধারণ করে গেছেন সর্বদা,সর্বত্র।কথাবার্তা,বাচনভঙ্গি,পোশাক পরিচ্ছদের অতিসাধারণ ব্যাপার গুলোই তাঁকে করেছে অসাধারণ।অবসরে দাবা খেলতেন বিখ্যাত লেখক কাজী মোতাহের হোসেনের সাথে যিনি ছিলেন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় দশকে যিনি ছিলেন ছাত্র,তিনি ই তৃতীয় দশকে হলেন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ই শিক্ষক।পাকিস্তান আন্দোলন,ভাষা আন্দোলন ও বাঙ্গালীর মুক্তিরসংগ্রাম,তিনটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার সাথেই যুক্ত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।তাই বলা হয় জনাব আবদুর রাজ্জাক বিশেষ সময়ের,বিশেষ যুগের মানুষ।মেধাকে কাজে লাগিয়ে যুক্তি দিয়ে বিচার করে গেছেন সমস্ত জীবন।তাই প্রচারবিমুখ বরেণ্য এই শিক্ষকের জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার সুবাদে আহমদ ছফার রচিত গ্রন্থটি শুধু যে জনাব আবদুর রাজ্জাক কে পরিচিত করিয়েছে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে,তা নয়,বরং মহামূল্যবান এই কালজয়ী গ্রন্থ সমৃদ্ধ করেছে বাংলা সাহিত্যকে।

More From Author

    None Found

What’s your Reaction?
+1
2
+1
27
+1
+1
+1
6
+1
+1
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
1
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x