Celebrate all success
Skip to toolbar

সারেং বৌ:অন্তহীন সংগ্রামী এক সাহসী নারীর আখ্যান

এক জীবনে নারীর লড়াই অন্তহীন।নারীকে সংগ্রাম করে যেতে হয় জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে,প্রতিটি পরিবেশে,প্রতিটি নি:শ্বাসে,জীবনের প্রতিটি স্তরে।কখনো কখনো প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে থেমে যায় নারী,আবার কখনো নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যায় সকল প্রতিকূলতা,প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে।জীবনযুদ্ধে নারীর এই জয় অনুপ্রেরণা যোগায় দুরন্ত পথিকের ন্যায় আরো অজস্র নারীদের।তাদের থেমে যেতে নেই,জীবনযুদ্ধে এভাবেই প্রতিটি পরতে পরতে লড়াই করে বাংলার গ্রামবাংলার নারীরা।শত বাঁধাও যেন এসে থমকে যায় নারীর সামনে।এ নারীরা হাল ছাড়তে জানে না।আবহমান বাংলায় প্রতিটি নারীর রয়েছে অন্তহীন সংগ্রামের আখ্যান।শুধু গল্পগুলো হয়তো কিছুটা বদলে যায়।তেমনি এক নারীর গল্প আজ বলা যাক।জীবনযুদ্ধে যে নারী হার মানেনি কখনো।জীবনের সকল বাধা কে নিশ্চিত জেনেও তিনি মোকাবেলা করে গেছেন তার অদম্য স্পৃহা দিয়ে।
গল্পটা নবিতুনের।

বিশিষ্ট লেখক শহীদুল্লা কায়সার এর এক অন্যবদ্য সৃষ্টি “সারেং বৌ”।একটা উপন্যাস কতটা সৃজনশীলতা দিয়ে রচনা করলে চরিত্র গুলোকে এভাবে জীবন্তভাবে উপস্থাপন করা যায়,তা লেখক প্রমান করে দিয়েছেন তার এই উপন্যাস টির মধ্য দিয়ে।লেখক ১৯৪৭ সাল থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়তার জন্য তিনি গ্রেফতার হন একাধিকবার।১৯৫৮ সালের ৭ ই অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান কতৃক সামরিক আইন জারির এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি গ্রেফতার হোন আবারো।জননিরাপত্তা আইনে তাকে আটকে রাখা হয় ১৯৬২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত।বন্দী থাকা অবস্থাতেই লেখক হাত দেন এই উপন্যাস টি তে।চরিত্র,ভাষা,উপস্থাপন কৌশল,প্রাঞ্জলতা,ঘটনাপ্রবাহে লেখক এই উপন্যাস টির মাধ্যমে বাংলা উপন্যাস কে নিয়ে যান এক অনন্য পর্যায়ে।বইটিতে লেখক “তাদেরই উদ্দেশ্যে” শিরোনামে যে উৎসর্গপত্র রচনা করেছেন,লেখকের দক্ষতা ও লেখনী বুঝার জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু বোধ হয় দরকার হবে না।

এই গল্পটি কয়াল নদীর তীরের উপকূলবর্তী বামনছড়ি নামের এক গ্রামের।অনেক গুলো চরিত্রের মধ্যে প্রধান চরিত্র নবিতুন ও তার স্বামী কদম সারেং।কদম জীবিকার তাগিদে জাহাজেই জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়ে দেয়।সারেং বৌ অর্থাৎ নবিতুনের চরিত্রই এই উপন্যাসে হৃদয়কে স্পর্শ করে যাওয়ার মত এক চরিত্র।১২ বছর বয়সে মজল সারেং এর ছেলে কদম
সারেং এর সাথে বিয়ে হয় নবিতুনের।সংসার সুখের কাটলেও কদম তার বাবার সাথে জীবিকার তাগিদে জাহাজে যাওয়ার কথা গুলা ভুলতে পারে না।তাই কিছুদিনের জন্য এলেও আবার ও চলে যায় জাহাজে।নবিতুন সর্বদাই কদমকে অনুরোধ করে অন্য সবার মত গেরস্থির কাজ করতে কিন্তু কদম সেই অনুরোধ যে রাখতে আগ্রহী নয়,সেটা বলা ই যায়।তাই নবিতুনের একমাত্র মেয়ে আককি কে নিয়েই জীবন পথের সংগ্রাম।প্রতিবার কদম সারেং ৩ মাস,৬ মাস পরে আসলেও একটা সময় বছর চলে যায় কিন্তু কদম সারেং আর আসে না।সবসময় চিঠি আসতো কদমের পক্ষ থেকে,টাকা আসতো কিন্তু একটা সময় সেটা আসাও বন্ধ হয়ে যায়।কদমের সাথে যোগাযোগের সবরকম উপায় ই বন্ধ হয়ে যায়।প্রতিটি দিন,প্রতিটি মুহূর্ত দুয়ারে কান পেতে থাকে নবিতুন,এই বুঝি এসে গেলো কদম সারেং।কিন্তু অপেক্ষার পাল্লা ভারী হতে থাকে,সেই সাথে চরম অভাবে একটা সময় হাজার লাঞ্ছনা,কটু কথা,অবমাননার শিকার হয়েও দাসীর কাজ নেয় চৌধুরী বাড়িতে।সারেং বাড়ির বৌ হয়ে দাসীর কাজ,যা নবিতুনকে আরো সকলের কাছে তিক্তভাবে বিরক্তিকর করে তোলে।ভীষণ অভাবেও নবিতুন অপেক্ষার দিন গোনে কদম সারেং এর।মেয়ের বয়স এগারো তে পড়লে বিয়ে দেওয়ার চিন্তাও মাথায় ঢুকে যায় নবিতুনের।মাঝে মাঝে এটা ভেবেই আরো কষ্ট পায় যে ছোট এই মেয়েটি বাবার আদর ও পায়নি খুব বেশি দিনের জন্য।তবুও সর্বদা একটা নি:শ্বাসের অপেক্ষায় থাকে।যে যাই বলুক,কদম সারেং একদিন হয়তো আসবে,এই বিশ্বাস টা মন থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও মুছতে পারে নি নবিতুন।

ALSO READ  ZERIN A LIE DETECTOR

অপরদিকে কদম জাহাজে জাহাজে আর বন্দরে বন্দরে ঘুরে বেড়ালেও মন টা সবসময়ই কাঁদে নবিতুনের জন্য।নিয়মিত চিঠি লিখে নবিতুন কে,টাকা পাঠায় কয়েকমাস পর পর।স্ত্রী আর মেয়ে আককি কে দেখতে না পেলেও সবসময় তাদের ভালো থাকাটাই যেন কদমের কাছে একমাত্র কাম্য।জাহাজী হলেও নিয়মিত বাড়িতে যাওয়া আসা করতো কদম।তার বাবাকে কথা দিয়েছিল জীবনে কখনো হারাম খাবে না,অবৈধ কাজ করবে না।বাবার কথা কোনোদিন ও সে অমান্য করেনি।কিন্তু জাহাজের মন্তু সারেং এর ফাদে পড়ে অবৈধ বস্ত বহনের জন্য একসময় পুলিশের কাছে ধরা পড়ে কদম।কয়েকবছরের জেল খাটতে হয়।কিন্তু কখনো জানায় নি সারেং বাড়ির বউ নবিতুনকে।বউয়ের মাথা নত হোক,এটা কখনোই চায়নি কদম।সাজা ভোগ শেষে একটা সময় সে ছাড়া পেলেও সে নবিতুনের কাছে ফিরে না গিয়ে জাহাজের কাজে মন দেয়।কিন্তু মন যে নবিতুনের কাছেই।জাহাজের অন্যরা বিভিন্ন বন্দরে মেয়েমানুষের সাথে অবৈধ সম্পর্কে হরহামেশা জড়ালেও নবিতুন কে কখনো ঠকায়নি কদম।নবিতুন কদমের জন্য অপেক্ষা করেই যখন মেয়ে আককি কে নিয়ে কোনোভাবে বেঁচে থাকতে শুরু করলো,সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে একদিন বাড়িতে চলে আসে কদম।

কদমের আগমনে নবিতুনের জীবনে নতুন হাওয়া বইতে শুরু করলেও তার আগের জীবন টা ছিল ভীষণ কষ্টের,হয়তো সেটা কারো পক্ষেই মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না,নবিতুন বলেই সম্ভব হয়েছিল।সমাজে একজন নারীর সংগ্রাম যেহেতু অন্তহীন,তাই তাকে লড়াই করতে হয় জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে।তাই একটা সময় লুন্দর শেখ কিংবা চৌধুরী বাড়ির ছোটো চৌধুরীর কুদৃষ্টিতেও পড়তে হয় নবিতুনকে।নবিতুনের যৌবন টাই যেন নবিতুনের বেঁচে থাকার জন্য কাল হয়ে যায়।এত শত কুদৃষ্টি,কটু কথা,অপমানের সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে হয় তাকে।আমাদের সমাজে লুন্দর শেখ বা ছোটো চৌধুরী অহরহ।জীবনটাকে দুর্বিসহ করার জন্য এরা যে কতটা অবদান রাখে,লেখক তা চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন বেশ ভালো ভাবেই।নবিতুন কে শুধু কথা ই শুনতে হতো,তাই নয়,একসময় ক্ষেতের ধারে লুন্দর শেখের আক্রমণের শিকার ও হতে হয় তাকে।এক মুঠো ভাতের জন্য যতকিছু করা দরকার,করেছিল নবিতুন।কিন্তু নবিতুনের এরকম কষ্টের কথা কখনোই ভাবে নি কদম,নিয়মিত টাকা তো পাঠাচ্ছিল ই সে।কিন্তু টাকা গুলো নবিতুনের হাতে আদৌ পৌছাতো কিনা তা জানা কোনো উপায় ছিল না।এভাবেই নবিতুনের জীবন সংগ্রামের বয়ান করেছেন লেখক।সমাজের আরো এক চরিত্রের কথা লেখক তুলে ধরেছেন গুজাবুড়ি কিংবা কামিজ বুড়োর মাধ্যমে যারা সমাজে প্রভাবশালী দের তোষামোদ করেই বিসর্জন দেয় নিজের সকল নৈতিকতাকে।

ALSO READ  টোকাই

তবুও কদমের আগমন বদলে দিয়েছিল নবিতুনের জীবন,কষ্টসমূহ হয়েছিল লাঘব।কিন্তু লুন্দর শেখের মত চরিত্রগুলো তখনো নবিতুনের সুখ চায়নি।তাই কটু কথা লাগাতে শুরু করে কদমকে।এছাড়াও কদমের নবিতুনকে পাঠানো সকল টাকা ও চিঠি পোস্টমাস্টার কে হাত করে নিজের কাছে আটকে রাখতো লুন্দর শেখ।স্ত্রীকে প্রচন্ড ভালোবাসতো কদম,কিন্তু আশেপাশের কটুকথা,মিথ্যে অপবাদ গুলো কে বিশ্বাস করে একটা সময় নবিতুন কে আঘাত করে কদম।মৃত্যু হয় সদ্যজাত ছেলে সন্তানের।জীবনে খুব কঠিন সময় গুলো লড়াই করেছিল যেই মানুষটির জন্য,একটা সময় সেই মানুষ গুলোও ভুল বুঝে আঘাত করে দূরে চলে যায়।তখন ও ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয় নারীকে।প্রিয় মানুষটির জন্য যতটুকু যা করা দরকার ছিল,কিছুই বাদ রাখেনি নবিতুন।তবুও কি সে তার ভালোবাসার প্রাপ্য পেলো কদমের থেকে?একটি প্রশ্ন রয়ে যায়।

জীবনের অনেকগুলো চড়াই উৎরাই যখন পেরিয়ে এসেছিল নবিতুন,প্রকৃতি হয়তো আরো একবার পরীক্ষায় ফেলতে চাইলো তাকে।বিশাল প্লাবন এলো জলোচ্ছ্বাস রূপে।অনেক উচু স্রোত এসে বিভীষিকাময় রূপ দিয়ে গেলো বামনছড়িকে।ঘর বাড়ি,পশু পাখি সব ভেসে গেলো।পানিতে ভাসলো জীবত মানুষ,মৃত লাশ,আকড়ে ধরার মত কিছুই তেমন ছিল না।কিন্তু এমন সময়ও নবিতুন,আককি কিংবা কদম,কেউ কারো হাত ছাড়েনি।ভালোবাসা দিয়ে হয়তো অনেক কিছু জয় করা যায় আবার কখনো ভালোবাসাটাই হারিয়ে যায় বানের স্রোতে।একটা সময় স্রোতে ভেসে যায় কে কোথায় আর খুজে পাওয়া যায় না।এভাবেই প্লাবন তীব্র থেকে তীব্রতর রূপ নিল।প্লাবন তো প্রভাবশালী,গরিব বলতে কিছু বোঝে না,তাই তার সাধ্যের মধ্যেই যা যা পেল,ভাসিয়ে নিয়ে গেলো।

একটা সময় প্লাবন শেষ হয়ে যায়।নতুন সূর্য উঠে,নতুন এক ভোরের সূচনা ঘটে।জ্ঞান ফিরে হাটতে লাগে নবিতুন।কোনো এক পাশে চোখ পড়ায় খুজে পায় কদম কে।জীবন টা এখনো হয়তো তার আছে।প্রাণপণ চেষ্টা করে নবিতুন,কদমকে হারাতে চায় না সে।তাইতো প্রচন্ড তৃষ্টায় যখন মৃত্যুযন্ত্রণা নিয়ে কাতরাচ্ছিল কদম,স্ত্রী হয়েও নিজের স্তন পাল করালো কদমকে।সকল বিধি নিষেদ,নৈতিকতাকে ছাড়িয়ে গিয়ে জীবন বাঁচানোর মত কাজটিকেই বেছে নিয়েছিল নবিতুন।স্তন মুখে দিয়ে কদম যখন জীবনের অন্যতম বড় আফসোস নিয়ে বললো,পর করে দিলি রে নবিতুন???কিন্তু নবিতুনের কাছে কদমকে আগলে রাখাটাই ছিল মুখ্য।একটা সময় আদি মানব মানবীর কত হাটতে থাকে কদম ও নবিতুন।আশেপাশে প্রচুর লাশ,বেঁচে আছে এমন কাউকে পাওয়া যায় নি।ভালোবাসার এই দুটি মানুষ ই এ যাত্রায় বেঁচে যায়,ছুটতে থাকে নতুন কোনো জীবনের খোজে,যে জীবন তাদের কে আর হয়তো পিছু ফিরে তাকাতে দিবে না।

ALSO READ  সাদা চকে, সাদা দেয়ালে - Jobair Riddhi : 4th Place Winner

শুরুতেই বলেছিলাম,এটি এক নারীর নিরন্তন সংগ্রামের আখ্যান।যে কোনো রকমের কুটনামি,অবমাননার বিরদ্ধে যে নারী সর্বদা ছিল শক্তিমতি,পুরুষশাসিত সমাজের গুটিকয়েক ব্যক্তির লালসার সুমুখে যে নারী ছিল সর্বদাই আগুনের ফুলকি,নিজের আপন মানুষের চরম অবিশ্বাসের স্বীকার হয়েও যে নারী ধৈর্য রেখেছেন অন্তরে,সেই নারীর ই গল্প এঁকেছেন লেখক শহীদুল্লা কায়সার।আবহমান বাংলায় নারীর এই সংগ্রামী জীবন নিয়ে এত শক্তিশালী লেখা হয়তো খুব কমই পাওয়া যায়,আর পাওয়া গেলেও তাদের মধ্যে এক শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে শহীদুল্লা কায়সারের “সারেং বৌ”।

More From Author

    None Found

What’s your Reaction?
+1
17
+1
+1
4
+1
+1
+1
+1
3
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
2
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x