ইয়েল ইউনিভার্সিটির Beinecke Rare Books & Manuscript Library তে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় বুক। কেনো একে পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় বই বলা হয়? এর একমাত্র কারণ হচ্ছে পৃথিবীর কোনো ব্যক্তি আজো পর্যন্ত এই বইয়ের মর্মার্থ উদঘাটন করতে পারে নি। কি এমন রয়েছে যা বের করা আজো পর্যন্ত এর রহস্য বের করা সম্ভব হয় নি যেখানে মানুষ রহস্য উদঘাটন করেছে এর থেকে রহস্যময় বস্তু যেমন Brown Lady of Raynham Hall, Bermuda Triangle, Stonehenge.

এই বইয়ের ভেতর রয়েছে বাঁকানো লেখা, হাতে আঁকা ছবি যেসব ছবি দেখে আপনার মনে হবে এই ধরণের আকার আকৃতি গুলো প্রায়শই আপনি স্বপ্নে দেখেন।
এছাড়াও আরো রয়েছে বাস্তব এবং অবাস্তব গাছপালা,ভাসমান প্রাসাদ, গোসলরত মহিলা, জ্যোতিবিদ্যার বিভিন্ন গঠন, রাশি চিহ্ন এবং চাঁদ-সুর্য যুক্ত বিভিন্ন বাক্যাংশ।

এই পান্ডুলিপিটির নাম “Voynich Manuscript” রাখা হয়েছে একজন পোলিশ বই বিক্রেতার নামের উপর।যার পুরো নাম হচ্ছে “Willfrid Voynich“. তিনি ছিলেন একজন পোলিশ রেভুল্যুশনারী যিনি পরবর্তীতে লন্ডনে বুক ডিলার হিসেবে স্থায়ী হন। ব্যবসায়ে ভালো করার পর তিনি নিউ ইয়র্ক সিটিতে একটি শাখা খোলার জন্য মনঃস্থির করলেন।এই উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি ইটালীর Jesuit Library থেকে ৩০ টি পান্ডুলিপি কিনেছিলেন। ভেলাম পাতার এই বইটি তার কাছে দেখে খুবই দুর্বোধ্য লাগলো এবং এই বইটি তার কাছে এশিয়ান লেখকের চেয়েও বেশি মনে হচ্ছিলো কোনো ইউরোপিয়ান লেখকের লিখা।
১৯৩০ সালে ভয়নিখ মারা গেলে এটা তার স্ত্রীর কাছে চলে যায় এবং তার স্ত্রী এটি ভয়নিখের এক বন্ধুকে দিয়ে দেন এবং পর্যায়ক্রমে তার বন্ধু এটি ১৯৬১ সালে নামকরা বই বিক্রেতা H.P. Kraus এর কাছে বিক্রি করে দেন। H.P. Kraus দাম বেশি চাওয়ার কারণে বইটি আর বিক্রি হয়নি এবং অবশেষে এটা তিনি Beinecke Library কে দিয়ে দেন এবং আজো এটা সেখানেই সমহিমায় সংরক্ষিত আছে।

ALSO READ  12 Activities to do during a Day Off

বইটিকে ছয়টি বিভাগে ভাগ করা যায় যেমন: উদ্ভিদতত্ত্ব,জ্যোতিতত্ত্ব,রাশিতত্ত্ব ,জীবতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব এবং ভেষজতত্ত্ব। উদ্ভিদতত্ত্ব রয়েছে সবচেয়ে বড় বিভাগজুড়ে যেখানে ১১৩ টি ওষধি গাছপালা সম্পর্কিত রঙ বেরঙের ছবি রয়েছে।গাছপালার গুলোর মধ্যে খুব যত্ন সহকারে কিছু লিখা রয়েছে।ক্রিপ্টোলজিস্ট দের মতে এই লিখাগুলোর সম্পূর্ণ একটি আলাদা ভাষা হওয়ার সব রকমের বৈশিষ্ট্য রয়েছে কিন্তু কেউই জানে না এই বর্ণ কিংবা অক্ষরগুলো দ্বারা আসলেই কি বোঝায়। দ্বিতীয় বিভাগের ১২ টি পৃষ্ঠার মধ্যে রয়েছে জ্যোতিতত্ত্ব এবং রাশিতত্ত্বের উপর অঙ্কিত বিভিন্ন চিত্র যেমন সুর্য,চাঁদ এবং বিভিন্ন রাশি চিহ্ন।

তৃতীয় বিভাগে রয়েছে অনাবৃত অবস্থায় গোসলরত মহিলাদের ছবি এবং চতুর্থ বিভাগে রয়েছে নয়টি মেডেলের ভিতর অঙ্কিত বিভিন্ন তাঁরা এবং আকৃতি।
পঞ্চম বিভাগে রয়েছে আবারও বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদের ছবি এবং এটাকে মেডিকেল বিভাগীয় জ্ঞানন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই বিভাগের সাথে উদ্ভিদতত্ত্ব বিভাগের পার্থক্য হচ্ছে এখানের গাছগুলো কোনো পাত্রের ভিতরে সংরক্ষিত ছিলো অথবা কিছু কিছু গাছের ছবি পুরো পাতা জুড়ে ছিলো।

অনেক মতবাদ রয়েছে এই পান্ডুলিপি কে নিয়ে। যেমন:-
১.অনেকের মতে এটাকে সাংকেতিক ভাষায় লিখা হয়েছে যাতে করে এটার মর্মার্থ কেউ বের কররতে না পারে এবং এর ফলে এর গুপ্ততা বজায় থাকবে।

২. এটা একটা ধোবাবাজি ছাড়া কিছুই না।এটা কোনো মধ্যযুগীয় শয়তান লোকের লিখা যিনি এটা লিখে উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে টাকা রোজগারের ধান্ধায় ছিলেন অথবা এই ব্যক্তিটি হতে পারেন ভয়নিখ স্বয়ং নিজেই।

৩. অনেকের মতে এই ভাষাটা অনেকটা Rongorongo Manuscript এর মতো যেটা আবিষ্কৃত হয়েছিলো ইষ্টার আইল্যান্ডে। পরবর্তীতে সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের পান্ডুলিপি ও বিলুপ্ত হয়ে যায়। এটি ও কোনো এক সভ্যতার ভাষা ছিলো এবং সে সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে যায়,রয়ে যায় শুধু এই পান্ডুলিপি যার মর্মার্থ শুধু সেই হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার লোকেরা বের করতে পারবে বলে ধারণা করা হয়।

ALSO READ  বাবুমশাই

এটা কখন লিখা হয়েছিল এই ব্যাপারে সঠিক তথ্য জানা যায় না তবে রেডিওকার্বন ডেটিংএর মাধ্যমে ধারণা করা হয় পনেরশ শতাব্দীর কোনো এক সময়ে মধ্য ইউরোপে এটি লিখা হয়।ধারণা করা হয় এই পান্ডুলিপিটির প্রথম ধারক ছিলেন রোমান রাজা দ্বিতীয় Rudolf যিনি ১৫৭৬ থেকে ১৬১১ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন।যদি রাজা Rudolf এটার অধিকারী হয়ে থাকেন তবে ধারণা করা হয় তিনি এটি ৬০০ Ducats( মধ্য ইউরোপের একসময়কার ব্যবহৃত মুদ্রা) এর বিনিময়ে গণিতবিদ John Dee থেকে কিনেছিলেন।এই বইটি রাজা Rudolf কিনেছিলেন এ ধারণার সুত্রপাত হয় একটি চিঠির মাধ্যমে,যে চিঠিটি তাকে লিখেছিলেন প্রাগের বিজ্ঞানী Johannes Marcus Marci। Voynich যখন এই পান্ডুলিপিটি কিনেন তখন চিঠিটি পান্ডুলিপিটির মধ্যে ছিলো।রাজা Rudolf এর পরের ধারক ছিলেন পত্রের লেখক Marci’র বন্ধু Baresch,যিনি তার মৃত্যুর সময় এটি Marci কে দিয়ে যান এবং তিনি মারা যাবার পুর্বে Jesuit Priest Athanasius Kircher কে এটি দিয়ে যান।এভাবে পরবর্তীতে এই পান্ডুলিপি Voynich এর হাতে এসে পড়ে।

বইটির মর্মার্থ উদঘাটনে যারা কাজ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার স্বনামধন্য ক্রিপ্টোলোজিস্ট William and Elizabeth Friedman, ইতিহাসবিদ Erwin Panofsky।এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন রসায়নবিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন দার্শনিকদের অবিরাম চেষ্টা। অনেকে এটাকে একটা ধাপ্পাবাজি বলে উড়িয়ে দিতে চাইলে ও Dr. Marcelo Montemurro এর মত ভাষাবিদদের নিবিড় গবেষণার ফল অন্য কিছুরই অর্থ বহন করে।

কি আছে এই আকার-আকৃতি, বৃক্ষ লতায় পরিপূর্ণ এই বইটিতে? এটা কি কোনো শিল্পীর মনের উদ্দেশ্যহীন কল্পনা নাকি কোনো অগাধ জ্ঞানের ভান্ডার যা আবিষ্কৃত হলে বদলে যাবে পৃথিবী? কোনো কিছুকেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একুশ শতাব্দীর এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে পান্ডুলিপিটির রহস্যের সুরাহা হবে এই আশা ব্যক্ত করছি।

What’s your Reaction?
+1
+1
8
+1
+1
+1
21
+1
+1
Author

A mere particle among innumerable ephemeral lives who dream big and dare to fall.

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x