Let it go
Skip to toolbar

কলকাতা ক্যাফে

★যারা মনের মধ্যে নীল রঙের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখেন তাদের জন্য। ★


– বাবা আমি ভাবছি একটা ক্যাফে খুলবো।
অনেকদিন ধরেই বাবাকে বলবো ভাবছিলাম। কিন্তু ২৭ বছর বয়সী বাঙালিদের সাহস একটু কম থাকে। তবু আমি সাহস করে বলে ফেললাম। আমি মানে তেজেন্দ্র রায়। নামে তেজ যতই থাকুক আমার মধ্যে সেটা একদম নেই। আমি সল্টলেকে আই টি কোম্পানিতে চাকরি করি। আমার ম্যানেজার খুব শান্ত লোক। ফালতু ঝামেলা করেন না কোনো। শুধু আমার যখনই ছুটির সময় হয় তখনই ওনার সব কাজের কথা মনে পড়ে।
– ভাই, এই দুটো ফাইল করে দিয়ে যাস।
মিষ্টি কথায় বাঁশ একে বলে। আমিও করে দেবো বলে আবার কাজে বসে পড়ি। বার খেয়ে বেশি তেজ দেখিয়ে পারবোনা বললে চাকরিটা টুক করে খসে যেতে পারে। এভাবে কতদিন সহ্য করা যায় আপনারা বলুন। তাই আমি আর আমার বন্ধু টোনি ঠিক করেছি পাড়ায় একটা ক্যাফে খুলবো। আমরা শনিবার রবিবার রকে বসে পুরো ছকে ফেলেছি। টোনি মারকাটারি বড়লোক। নিজে কিছু করেনা। আইডিয়াটা ওর। আমার শুনে দারুন লেগেছিলো। আমি বাংলা সিনেমায় দেখেছি নায়করা ব্যবসা করলেই ঝুপ করে নাম করে ফেলে। তাই আজ খাওয়ার টেবিলে বসে বাবাকে বলেই ফেললাম। বাবা শুনেই ব্যাপারটা বোঝেনি।
– শুনছো? আমার প্রেসারের ট্যাবলেট টা দিও তো শোয়ার সময়। কিসব ভুলভাল শুনছি। প্রেসার বাড়লো মনে হয়।
বাবা মাকে হাঁক দিলো।
– না না বাবা ভুল শোনো নি। আমি ক্যাফে খুলবো। চাকরি করবোনা।
বাবা কিছুক্ষন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। আমি হাতে মাংস নিয়ে বসে আছি। বেশ একটা ড্রামাটিক সিন। ব্যাকগ্রাউন্ডে ধুম তানা বাজনার জায়গায় রান্নাঘরে বাসনের আওয়াজ হচ্ছে।
– বাবা ওতো সিরিয়াল দেখিস না। ওসব সত্যি না। ওসব ঠাকুমার ঝুলির মত।
মানছি সিরিয়াল সিনেমা সত্যি না। আমার স্বপ্ন টা তো সত্যি।
– কেন অসুবিধা কি? তোমার তো জমানো টাকা আছে। ব্যবসা না করলেও আমি যা হোক করলেই আমাদের বেশ চলে যাবে।
বাবা মুখটা কেমন অন্যরকম করলো। লক্ষন তো ভালো ঠেকছে না।
– ও টাকা আমি আর তোর মা ইউরোপ টুরে যাবো বলে রেখেছি তোর বিয়ের পর।
মানে? এতো আচ্ছা কেলো। ছেলের স্বপ্নের থেকে ইউরোপ ট্যুর বড় হলো? এই ওয়েস্টার্ন কালচার একদম সব শেষ করে দিলো। বাবাকে এইসব সেন্টু দিয়ে লাভ নেই। এমনিই টাকার ভাগ দেবেনা বলছে। বেশি বললে বাড়ি থেকে বের না করে দেয়। যা করতে হবে নিজেই করতে হবে।

শনিবার দিন আমি আর টোনি কালুয়ার চায়ের দোকানে বসে আছি। কালুয়া আমাদের বয়সি। পাড়ার একমাত্র চায়ের দোকান। ভালোই ভিড় হয়। সকালে কালুয়া আবার পাকোড়া বানায়। বিকেলে আলুর চপ।
– এ কালুয়া, আমরা কফি সপ খুলবো। তুই হবি হেড সেফ। চা কফি বানাবি। বল করবি?
টোনি কালুয়াকে বললো। কালুয়ার চায়ের হাত পুরো খাসা। আর পাকোড়া তো চুমু পুরো। কালুয়া কিছুক্ষন আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকলো।
– আপনারা এক কাম করেন। নয়া দুকান আছে। হামাকে ফির পার্টনার লিয়ে নিন। হামার স্যালারি আপলগ এফোর্ড করতে পারবেন না।
কালুয়া আমাদের দুজনকে অবাক করে বললো।
ওরে শালা এত পুরো ভ্লাদিমির পুতিন মার্কা attitude। কালুয়া কি খিল্লি করে দিলো নাকি আমাদের। বাবা থেকে কালুয়া কেউ ছাড়ছে না দেখছি।
ক্যাফে খোলা হৰে টোনিদের বাড়ির গ্রাউন্ড ফ্লোরে। দুটো বড় ঘর আছে। একটা কিচেন আর একটা বসার জায়গা হবে। নকশা পুরো ছকা আছে। সমস্যা একটাই।। বাবা কাল আমাকে জিজ্ঞাসা করছিল আইফেল টাওয়ার কটা অব্দি খোলা থাকে। যাই হয়ে যাক বাবা মা মনে হচ্ছে ইউরোপ যাবেই। এবার ব্যবসা না জমলে আমাকে না শেষে কালুয়ার দোকানে চাকরি না নিতে হয়। টোনির বাবা এদিক দিয়ে ভালো। উনি রাতে দু পেগ হুইস্কি পেলেই খুশি।

আমরা চাটার্জিদের রকে গিয়ে বসলাম। উত্তর কলকাতার রক ব্যাপারটা এখনো উঠে যায়নি। কেউ কারুর রোয়াকে বসলে ভাগিয়ে দেয়না। এই বছর পুজোর পর দিয়েই একটু একটু শীত পড়তে শুরু করেছে। চা কফি মিলিয়ে কলকাতায় উৎসবের মরসুম আসতে চলেছে।
– বুঝলি টোনি, ক্যাফের দেওয়ালে কিছু ওল্ড কলকাতা পেন্টিং থাকবে। নর্থ কলকাতা ওই সাউথ ফাউথ না। নিজের নিজের ব্যাপার হবে।
আমি চোখের সামনে পুরো ইন্টেরিওর টা দেখতে পাচ্ছি। সত্যজিৎ রায় সিনেমা বানানোর আগে এরকম দেখতে পেতেন শুনেছি।
– সেসব তো হবে। কিন্তু কাকু কি বললো? চাকরি ছাড়বি শুনে?
টোনি জিজ্ঞাসা করলো।
– আরে বাবা খুব খুশি।। ছেলের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে বলে বাবা মা ইউরোপ ট্যুর যাবে প্ল্যান করছে।
সবসময় সত্যি বলতে নেই। বললে প্রেস্টিজ ড্যামেজ হয়।

ALSO READ  এই আমি

বাঙ্গালী ছেলেদের ফ্যামিলির অমতে ব্যবসা করা আর এভারেস্টে ওঠা এক ব্যপার। যদিও আমার মনে হয় এভারেস্ট টা তুলানমূলক ভাবে একটু সহজ। আমি আর টোনি বেশ ভালোমত টাকা খরচ করে ঘর পরিষ্কার করেছি। দেওয়ালে নীল রং করিয়েছি। চোর মার্কেট থেকে কিছু দারুন দেখতে চেয়ার আর টেবিল আনানো হয়েছে। আর দেওয়ালে কলকাতার ফটো। উফ পুরো জমে গেছে ইন্টেরিয়ার। কেঁচাল বাধলো নাম ঠিক করার সময়।। আমি ভাবছিলাম নাম হবে ‘ কলকাতা আর কফি ‘ আর টোনির পছন্দ ‘ ক্যাফে কর্নার ‘। হেড টেল এই তাই করে শেষে ঠিক করলাম আমার থেকে কলকাতা আর টোনির থেকে ক্যাফে নেওয়া হবে। নাম হবে ‘ কলকাতা ক্যাফে ‘। নূতন আনা চেয়ার টেবিলে বসে আমরা বিজনেস প্ল্যান আলোচনা করছিলাম।
– বুঝলি, কালুয়াকে পার্টনার নিয়েই নি। কি বলিস?
টোনি আমাকে বললো। আমি ঠিক বুঝলাম না। টোনি কি কম্পিটিশন নিয়ে ভয় পাচ্ছে।
– কেন বলতো?
আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
– দেখ, কালুয়ার একটা কাস্টমার বেস আছে। তাছাড়া ওর রান্নার হাত দারুন। ওকে দিয়ে হবেই।
কথাটা টোনি কিন্তু মন্দ বলেনি। কথাবার্তা শুনলেই বোঝা যায় এই ছেলের রক্তে ব্যবসা। আমার মত ইয়েস স্যার বলতে জন্মায়নি।
আমরা দুজন বিজনেস অফার নিয়ে কালুয়ার কাছে যাচ্ছি। নিজের কেমন একটা গর্ববোধ হচ্ছে। এরকম চললে কয়েক বছর পর মার্কেটে শেয়ার ছাড়তে হবে। কালুয়া ওর দোকানে বসে বিড়ি ফুঁকছিলো। এটা ওকে বারণ করতে হবে। ক্যাফেতে বিড়ি টিড়ি ফোঁকা যাবেনা।
– কালুয়া, তোর কথাটা ভেবে দেখলাম। তোকে আমরা পার্টনার বানাবো। তুই পুরো কিচেন সামলাবি।
টোনি ধানাই পানাই না বলে ডাইরেক্ট কথা বললো। একে বলে বিজনেস অফার করা। কালুয়া বিড়িটা ফেলে আমাদের দিকে তাকালো।
– ঠিক আছে। ও ফির আমি সামলে নেবে। কিন্তু কফির সাথে চা ভি রাখনা পাড়েগা।
কালুয়া এবার নিজের টার্মস রাখছে। চা আমরা এমনিই রাখবো ঠিক করেছিলাম। চা বাঙালির কাছে সবসময় নতুন লাগে। পাড়ায় নতুন আসা বৌদির মত। যতবারই দেখা হোক পুরোনো কিছুতেই হয়না।
– চা কফি সব রাখেগা। এখন চা দে দুটো। আর দোকান বন্ধ করে আমার বাড়ি আসিস। মিটিং করবো।
টোনি কালুয়াকে বললো।
– ও ফির ভাববেন না। আমাদের কফিশপ ফাটিয়ে দেবে।
কালুয়ার উৎসাহ দেখে বুঝলাম একে দিয়ে হবে।

আমি আজ চাকরিতে নোটিস দিয়ে দিলাম। ব্যবসা করবো বলে চাকরি ছাড়ছি শোনার পর দিয়ে অফিসের সবাই ধন্য ধন্য করছে। যেন আমি বিশ্ব বেকারত্ব দূর করে ফেলেছি। অনেকে তো আমায় হারকিউলিসের সাথে তুলনা করছে। এইসব বাবাকে শোনানো দরকার। নোটিশ মানে আমার চাকরি এখনো একমাস আছে। তাই বাড়িতে ভাবছি এখনই কিছু বলবোনা। কটা দিন যাক। ব্যবসা না চললে নোটিশ টা তুলে নেবো। সমস্যা একটাই অফিসের কেউ না কেউ এখন এসে বিজনেস প্ল্যান শোনাচ্ছে। আচ্ছা মুশকিলে পড়া গেলো।

আমি টোনি আর কালুয়া আমাদের ক্যাফে ওপেনিং করে ফেলেছি। সোম থেকে শুক্র আপাতত সকালে আমি থাকতে পারিনা। বিকেলটা থাকি আমি। কালুয়ার রান্নার হাত আর চা কফি আর কাস্টমার বেস ভালোই কাজে এসেছে। প্রথম দিন থেকেই আমাদের কলকাতা ক্যাফেতে ভালো ভিড় ছিলো। কালুয়া বলেছিলো।
– কি বলিয়ে ছিলাম না? ফাটিয়ে দেবে।
কলকাতা ক্যাফে মনে হচ্ছে ফাটিয়ে দেবে সত্যি।
শনিবার আর রবিবার আমি গোটাদিন ক্যাফেতে থাকি। বাড়িতে এখনো জানেনা আমি চাকরির নোটিশে আছি। ওনারা ভাবছেন ছেলে চাকরি ব্যবসা দুই করছে ফলে ওনাদের ইউরোপ যাত্রা সুগম হচ্ছে আরো। ক্যাফের ভিড়ের জন্য কালুয়ার একজন আসিস্টেন্ট রাখা হয়েছে। ক্যাফেতে কাজের লোক বাড়ছে মানে বুঝবেন পকেটে টু পাইস ঢুকছে। শনিবার বিকেলে ঋতি এলো। ঋতি আমাদের পাড়ার বান্ধবী। শনিবার বা রবিবার করে ঋতি প্রতি সপ্তাহে আসে আমাদের ক্যাফেতে। কিন্তু ঋতি আজ যাকে নিয়ে এলো তাকে দেখে বা বিদ্যুৎ কোম্পানির দোষেই হোক ঝুপ করে লোডশেডিং হয়ে গেলো। ওরকম অবন ঠাকুরের মত আঁকা চোখ বোধ হয় আমাদের ক্যাফের সহ্য হয়নি। কুর্চি এসেছে ঋতির সাথে। কুর্চিরা আমাদের পাড়ায় নতুন এসেছে। ছাই রঙা চোখ আর এরকম গালে টোল পাড়ায় এসে পড়লে পাড়া একটু বেসামাল হয়ে যায়। আমিও হয়েছি। আমি অফিস যাওয়ার সময় একটু ঘুরপথ হলেও কুর্চির বাড়ির সামনে দিয়ে যাই। কলকাতায় সব ভালো জিনিস একটু ঘুরপথে আসে। ব্যালকনিতে মাঝেমধ্যে কুর্চি দাঁড়িয়ে থাকে মারকাটারি চোখ আর টোল নিয়ে। আমি আমার মধ্যবিত্ত ভীরু প্রেম নিয়ে ‘ গোঠে ধবলী চরাই রাই তোমার রূপের কিবা জানি ‘ গোছের একটা লুক দি।

– তোরা কি জেনারেটর লাগাবি না?
ঋতি একটু বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
– আছে তো। সেটা কিচেনে লাগে।
আমি বললাম। জেনারেটর নেই বলে আমরা কয়েকটা স্পিরিট ল্যাম্প রেখেছি। আইডিয়াটা আমার। কলকাতায় শীত আসছে। কারেন্ট চলে গেলে এখন অসুবিধা নেই। গরমে অন্য কিছু ভাবতে হবে।
– ল্যাম্পের আইডিয়াটা দারুন তো।
একটা হাওয়া থমকে দেওয়া ভাবে কুর্চি বললো। ক্যাফের সব ল্যাম্প গুলো যেন প্রশংসা শুনে জোরে জ্বলে উঠলো।
– আসলে ভাবলাম একটা পুরোনো ফিল আনা যাবে।
আমি কোনোরকমে ঢোঁক গিলে বললাম। আমার নিজেরই মনে হচ্ছে এক কাপ কফি দরকার।

ALSO READ  চিব়চেনা

– কিরে তাজো পাড়ার নতুন মেয়েটাকে দেখেছিস?
টোনি আমি আর কালুয়া বসে পনেরদিনের হিসেব করছি। টোনি হিসেবের মাঝে বলে উঠলো।
– কোন মেয়েটা বলতো।
আমি ঠিক বুঝলাম না। টাকা পয়সার হিসেব আমাকে একটু মন দিয়ে করতে হয়। নাহলে ভুল হয়ে যায়।
– ঐতো ঋতি দিদির সাথে আসেন। এলেই আপনি ফির হাঁ করিয়ে থাকেন।
কালুয়া আমাকে লক্ষ্য করে বললো। কুর্চির কথা বলছে। কুর্চির কথা মনে হতেই সব হিসেব কেমন গোলমাল হয়ে গেলো। আবার প্রথম থেকে করতে হবে।
– ভাগ ভাট বকিস নাতো।
আমি কালুয়াকে বললাম।
– কালুয়াকে বললে হবে? গুরু তুমি বেশি ঘুরে বড় রাস্তার মোড়ে যাচ্ছ। আমি কি দেখিনা নাকি?
এবার কালুয়া আর টোনি দুজন হেসে উঠলো। ওরা আর কি করে বুঝবে? কুর্চিদের গলিতে শীত একটু বেশি পড়ে। কলকাতার শীত ভীষণ দামী।

আজ আমার অফিসের শেষ দিন। দেখতে দেখতে একটা মাস কেটে গেলো। নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে আমাদের কলকাতা ক্যাফে ভালোই চলছে। মেনুটাও এখন বড় হয়েছে একটু। কালুয়া কিচেন ভালোই সামলাচ্ছে। আমি আর টোনি সার্ভিস আর ক্যাশ কাউন্টার সামলাই। মাঝে মাঝে নিজের খুব গর্ব হয় ক্যাফে টা নিয়ে। স্বপ্ন যতই ছোট হোক সত্যি হলে একটা নীল রঙা আনন্দ হয়। আজ বাড়ি ফিরে চাকরি ছেড়ে দিয়েছি জানিয়ে দেবো। ব্যবসার পসার যেমন বেড়েছে বাড়িতে আপত্তি হওয়ার কথা নয়। না বাড়িতে কোনো ঝামেলা হয়নি। এবার থেকে আমিও টোনি আর কালুয়ার মত পুরো সময়টা ক্যাফেতে দিতে পারবো। স্বপ্ন দেখার চেয়েও তাকে বাঁচিয়ে রাখাটা অনেক বেশি দামী। আমি অফিস থেকে ফেয়ার ওয়েলে পাওয়া নতুন ঘড়িটা পরে ক্যাফেতে এলাম। দেখলাম ঋতি বসে আছে সাথে শোভন আর এলিনা আছে। এরা আমাদের সব পাড়ার বন্ধু। আমাদের ক্যাফের স্পেসটা বাড়াতে হবে এইবার। ইদানিং নতুন লোকও আসছে কিছু দেখছি। রবিবার করে তো বাইরে লাইন পড়ে। আজ আমাদের মোমো ছিলো প্রথমবার। কয়েক ঘন্টায় ফুল স্টক খালি। আসলে শীতকাল আর মোমো কলকাতার সাথে মিশে গেছে একদম।
– তোদের মোমোটা দারূন হয়েছে রে।
ঋতি বেরোনোর সময় বললো।
– আরে সব কালুয়ার গুন। কিচেন তো ওই সামলায়।
আমি বললাম। কালুয়া পাশেই ছিলো। নিজের গুণের কথা শুনে বুকটা একটু চিতিয়ে নিলো।
– দিদি ও ফির আপনি আচ্ছা বললেন ওতেই আমি খুস।
কালুয়া উৎসাহ নিয়ে বললো।
– এই ঋতি শোন।
ঋতি বাইরে বেরিয়ে গেছিলো। আমার ডাক শুনে আবার ফিরে এলো। শোভন আর এলিনা এগিয়ে গেলো একটু।
– তোর নতুন বান্ধবী কুর্চির কোনো বয়ফ্রেন্ড আছে?
বলেই দেখলাম টোনি আমার দিকে এরকম করে তাকালো যেন আমি সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা খারাপ বলে ফেলেছি।
– কেন বলতো?
ঋতি একটু অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো।
– না না এমনি। দেখি তো ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলে।
আমি একটু হে হে করে হেসে উঠলাম। না হাসলে কেসটা বিগড়ে যেতে পারে।
– কে জানে? আমি ঠিক সিওর না।
বলে ঋতি শোভন আর এলিনার সাথে চলে গেল।
– তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে?
ঋতি বেরোতেই টোনি আমাকে বললো।
– কেন কি হলো?
আমি বুঝেও না বোঝার ভান করলাম। না বোঝার ভান করলে নিজেকে একটু ডিফেন্ড করা যায়।
– ঋতির মত পেটপাতলা মেয়েকে তুই এই জিজ্ঞাসা করলি? পুরো বাঁশ কেন ঝাড়ে কেস করেছিস।
টোনি বললো।
– বাঁশ ফির ঝাড়ে নেইতো কুথায় আছে?
কালুয়া প্রশ্ন করলো।
– কোথায় আছে তোমার তোজোদা টের পাবে। দাঁড়াও না।
ঋতির পেটপাতলা বলে সত্যি বদনাম আছে। তারউপর আবার সব বাড়িয়ে বলে। না বললেই ভালো করতাম বোধ হয়। এখন শুধু প্রার্থনা করছি বাঁশটা যেন আছলা না হয়।

চাকরিটা না থাকায় একটু হলেও ঝাড়া হাত পা লাগছে। আমি আজ সকাল ৯টা নাগাদ বিবেকানন্দ রোড যাচ্ছি। আমার এক পেন্টার বন্ধুর বাড়ি। ওকে দিয়ে ক্যাফের দেওয়ালে একটা ডিজাইন করবো। শীতের দিকে কলকাতার ট্রাম যাত্রা এক অদ্ভুত অনুভূতি। আমারও সেরকম হলো আজ। ট্রামে উঠেই দেখি কুর্চি বসে আছে। ট্রামের জানলা দিয়ে কফি কাপের ধোঁয়া ওঠা রোদটা ওর অবন ঠাকুরের আঁকা মুখটায় পড়ছে। কয়েকদিন হলো কুর্চি ক্যাফেতে আসেনি। আমি ট্রামে উঠতেই কুর্চির মারকাটারি চোখের সাথে চোখাচুখি হয়ে গেল। ক্যাফের সুবাদে একটু জানাশোনা আছে। আমি হেসে একটু এগিয়ে গেলাম। তাছাড়া এরকম সময় মন নিয়ন্ত্রণে থাকেনা। কাছে গেলে কুর্চি আমার দিকে একবার তাকালো।
– আমার বয়ফ্রেন্ড আছে নাকি জানতে আমার পিছু নিয়েছো নাকি?
কুর্চি এত জোরে বললো যেন মনে হলো পুরো ট্রামে যেন একটা বোমা পড়লো। একজন ভদ্রলোক হয় খুব পরোপকারী নাহয় বউয়ের সাথে অশান্তি করে বেড়িয়েছেন। তিনি টারজানের মত আমার সামনে লাফ দিয়ে এসে পড়লেন।
– কে পিছু নিচ্ছে মামনি। এই ছোকরা? দেব নাকি টাইট?
এইসব টাইট ফাইট শুনলে আমার আবার ভয় ভয় লাগে। কি না কি টাইট দেবে ঠিক নেই।
– কিছু দিতে হবেনা আপনাকে। আপনি চুপ করে বসুন।
কুর্চি ফোঁস করে উঠলো। এত সুন্দর চোখে এত রাগ? কুর্চি এবার আমার দিকে তাকালো।
– চল এখানে নামবো।
আমিতো বিবেকানন্দ রোড যাচ্ছি। কাশি বোস লেনে কেন নামবো বুঝতে পারলামনা। কিন্তু এই রূপ দেখে আমার জিজ্ঞাসা করার সাহস ও হলোনা। আমি সাঁতার না জেনে সমুদ্রে নামার মত নেমে পড়লাম। কুর্চি আমাকে নিয়ে একটা গলিতে ঢুকলো। এইরে, মার্ডার করবে নাকি? গলিটা এমনিও কেমন ব্যোমকেশ বক্সীর যুগে আটকে আছে। আমি কি তাহলে প্রেমের শহীদ হবো?
– তুমি কি খুব ভীতু?
কুর্চির এই প্রশ্নে আমি একটু থতমত খেয়ে গেলাম। মনে মনে বললাম আমি একটুও ভীতু নই। তুমি বললে বুক চিতিয়ে বজরং দলের সামনে তোমাকে চুমু খেতে পারি। কিন্তু এসব বললে খারাপ দেখায়। তাই আমি ছোট্ট করে একটা না বললাম।
– তাহলে আমার বয়ফ্রেন্ড আছে কিনা আমাকে ভালোবাসো এসব লোক মারফত জানানোর কি মানে?
কুর্চির চোখদুটো আরো ছাই রঙা লাগছে। কুর্চি আমার এত কাছে দাঁড়িয়ে আছে আমি ওর ডিওর গন্ধটা পাচ্ছি। শীতের শিশিরের মত মন ভালো করা গন্ধ।
– আমি ভালোবাসি বলিনি তো।
আমি কুর্চিকে বললাম। বুঝলাম ঋতি বলতে বলতে বোঝেনি কতটা বলবে। পাড়ায় ফিরে ওর খবর নিতে হবে।
– মানে বাসনা! এমনি টাইমপাস করতে খবর নিচ্ছিলে? ক্যাফের সব মেয়ের খবর নাও?
কুর্চি আবার ঝাঁজিয়ে উঠে বললো।
– না সেটা নিইনা।
আমি মাথা নিচু করে বললাম।
– আর শোনো আমার কোনো বয়ফ্রেন্ড নেই। ওই হলুদ বাড়ি ঐটা আমার পিসিবাড়ি ঐখানে এসেছি।
কুর্চি বলে হনহন করে হাঁটা লাগালো।কুর্চির কথায় আমার একটু চমক লাগলো। গলিতে একটু শীত শীত ভাব লাগছে। আমার পরের ট্রামটা ধরা হলোনা। শীতের রোদ গায়ে পড়লে মনটা অদ্ভুত খুশি হয়। আমারও জানিনা কেন ভালো লাগছে।

ALSO READ  আমাদের প্রিয় রং

পাক্কা দেড়দিন ঋতির কোনো খোঁজ নেই। ভুল করেছে ভেবে পালিয়ে গেল নাকি? কুর্চি বোধ হয় ডোজ দিয়েছে। আমি রুনুদার দোকান দিয়ে কালুয়ার জন্য একটা সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে ফিরছিলাম। কালুয়া এখন বিড়ি খায়না। রাস্তায় হঠাৎ ঋতির সাথে দেখা। আমাকে দেখে দৌড়ে পালাতে যাচ্ছিলো। আমার সাথে পারবে কেন? আমি রোজ অফিসের সময় দৌড়ে বাস ধরা ছেলে। ঠিক ধরে ফেললাম।
– কি ব্যাপার? বাঁশ দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিস যে। টমাস রো হয়েছো? জাহাঙ্গীরের সভায় খবর পৌঁছাছো? তোর খবর আজ আমি নেবো।
ঋতি হাত টাত জোর করে সে এক কান্ড।
– বুঝিনি রে ওরকম খিঁচ খেয়ে যাবে। তোর ভালোর জন্য তো করতে গেছিলাম বল।
ঋতি বললো।
– ভালো করতে গিয়ে এমন বাঁশ দিয়েছিস। তোর মোমো ডিসকাউন্ট একমাস বন্ধ।
আমি ঋতি কে বলে দিলাম।
– ফালতু ওকে বকছো কেন?
আমি পেছনে না তাকিয়েও সেই মন ভালো করা শিশিরের গন্ধটা পেলাম। গলাটা শুকিয়ে এলো। চট করে পেছনে ফিরলাম। অবন ঠাকুরের আঁকা মুখ।
– না না বকছি কৈ? আমি ওর সাথে এভাবেই কথা বলি।
কি বলবো না বুঝে এই বললাম।
– এরকম কথা বলা ছেলে আমার ভালো লাগেনা। আর তুমি বৃষ্টি ভিজতে ভালোবাসো?
কুর্চি একটু গম্ভির হয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
– না মানে, ঠান্ডা লাগে আমার।
আমতা আমতা করে বললাম। প্রশ্নের তো মাথামুন্ডু কিছু বুঝছিনা।
– আমি বাসি ভিজতে। তুমিও অভ্যাস করো। সামনের বর্ষায় ভিজতে হবে তো?
কুর্চি হেসে এগিয়ে গেলো। আমি আর ঋতি হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। কি হলো বলুন তো? আপনারা কিছু বুঝলেন???

◆◆◆◆◆◆◆ শেষ ◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆

More From Author

    None Found

What’s your Reaction?
+1
+1
6
+1
+1
+1
5
+1
+1
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x