আমি কদিন হল বুতাই কে নিয়ে চিন্তায় আছি। আসলে বুতাই এর বয়স মাত্র ৪ বছর। রোজ খালি মা মা করছে ইদানিং। খেতে বসে একদিন দেখি একা একা হাসছে। আমি কি হয়েছে বুতাই জিগ্যেস করায় বলল আমার পেছনে দাঁড়িয়ে ওর মা নাকি খাওয়া দেখছে। বুতাই কি তবে হ্যালুসিনেট করছে? কারন বুতাই ওর মা কে দেখতেই পারেনা। বুতাই এর মা মানে আমার স্ত্রী অত্যন্ত জঘন্য এক মহিলা। ৪ বছরের ছেলে আর স্বামীকে ছেড়ে যে মহিলা নতুন প্রেমিক বানিয়ে পালাতে পারে সে মহিলা আর কিছু হোক মানুষ নয়। আমি অফিস থেকে ফিরে দেখতাম যে সুবীর বসে আছে কিন্তু সেটা ভাবতাম আমার সঙ্গে দরকারে। তলে তলে ব্যাপারটা যে এতটা বেড়েছে সেটা আমি ঘুণাক্ষরে টের পাইনি। টের সেদিন পেলাম যেদিন অফিস ফিরে ঘরটা ফাঁকা পেলাম আর সুনিতার লেখা একটা চিঠি, যে সে সুবীরের সাথে চলে যাচ্ছে আমি যেন বুতাইএর খেয়াল রাখি। এক নিমেষে আমার যেন পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেছিলো। এই জন্য বুতাইকে সুনিতা দুদিন আগে পিসি বাড়ি রেখে এসেছিলো যাতে এই জঘন্য কাজটা করতে পারে। সুনিতার উপর ঘেন্নায় গা রি রি করছিলো সেদিন। আমি বুতাইকে আরও কদিন রেখে দিয়েছিলাম। এসে দু তিনদিন মা মা করছিলো। তারপর যখন আমি বলেছিলাম মা ঘুরতে গেছে শুনে কিছু বলেনি খালি কবে মা ফিরবে জিগ্যেস করেছিলো। আমি কিছু বলিনি বুতাই ও আর কিছু প্রশ্ন করেনি।

সুনিতা না থাকায় আমার কাজের চাপ খুব বেড়েছে। সকালে বুতাই এর স্কুলের টিফিন বানিয়ে দেওয়া, রেডি করে দেওয়া সব আমাকে করতে হয়। বুতাইকে স্কুলে ছেড়ে আমি অফিস চলে যাই ওর পিসি মানে আমার ছোট বোন আমাদের বাড়ি থেকে একটু দুরেই থাকে ওকে ছুটি হলে নিজের কাছে রাখে আমি বাড়ি ফেরার সময়ে ওকে নিয়ে যাই। আজ আমার একটু লেট হয়ে গেছে অফিসে। বেরনোর সময়ই বসের সব কাজ মনে পড়ে। যেই বেরোতে যাবো অমনি দত্ত এই ফাইল রিপোর্ট টা দিয়ে যেও। আগে বলতে এদের কি হয় বুঝিনা। তোদের লাইফ নেই বলে কি আমার ও নেই নাকি? এটা ভেবেই আমি একটু থমকে গেলাম, সত্যি কি কিছু লাইফ আছে আমার? নেহাত বুতাই আছে বলে নাহলে হয়তো আমি সুইসাইড করে নিতাম। সুনিতা আমাকে পুরো ভেতর দিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে গেছে। আমার বোনের বাড়ি পৌঁছাতে আজ একটু লেট হল আজ। দেখি বুতাই ওর পিসতুতো বোনের সাথে খেলছে। আমাকে দেখেই বুতাই লাফ দিয়ে উঠে এলো।

  • দাদা শোন, তোর সাথে কথা আছে। একটু এই ঘরে আয়।
    আমি আমার ছোট বোন শিখার কথা শুনে বুতাইকে ওই ঘরে রেখে গেলাম।
  • তুমি বস বুঝলে? আমি পিসিমনির সাথে কথা বলে আসি।
    বুতাই মাথা নেড়ে আবার খেলায় বসে গেলো।
  • বল শিখা, কি বলবি?
    আমি শিখার খাটে বসে প্রশ্ন করলাম।
  • দাদা বুতাইকে ডাক্তার দেখা। ওর কথাবার্তা আমার ঠিক ভালো লাগছেনা।
    শিখার কথা শুনে আমি অবাক হলাম।
  • কোন কথাবার্তা?
    আমি শিখাকে জিগ্যাসা করলাম।
  • আজ বুতাই বলছে কাল মা নাকি ওকে এসে গল্প বলছিল রাতে। তুই এক কাজ কর ওকে সাথে নিয়ে শো আজ থেকে।
    শিখা বলল।
  • হ্যাঁ আমি জানি বুতাই কদিন হল হ্যালুসিনেট করছে। আমি আসলে পাত্তা দিচ্ছিলাম না ব্যপারটা। কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি হলে ডাক্তার দেখাতে হবে বইকি। মহিলা আমার জীবন একেবারে শেষ করে দিয়ে গেলো।
    আমার বুক ঠেলে একটা কান্না বেরোতে চাইলো কিন্তু শিখার সামনে কাঁদলে শিখা আমাকে নিয়ে টেনশনে পড়ে যেতে পারে। তাই আমি তাড়াতাড়ি উঠে এলাম। বুতাইকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়।
  • বুতাই আইসক্রিম খাবে?
    আমি বুতাইকে জিগ্যাসা করলাম। বুতাইকে আইসক্রিম বললে না বলেনা কখনো। আইসক্রিম বলতে বুতাই পাগল। আমি বুতাইকে একটা আইসক্রিম কিনে দিলাম। বুতাই মহানন্দে আমার হাত ধরে লাফাতে লাফাতে এগোচ্ছে।
  • বুতাই, তুমি মাকে দেখতে পাও?
    আমি অনেক ভেবে প্রশ্ন করলাম।
  • হ্যাঁ পাবো না কেন? মা তো বাড়িতেই থাকে। সবসময় দেখি।
    বুতাই খুব স্বাভাবিক ভাবে বলল।
  • মা কি পরে থাকে?
    জানিনা কেন এই প্রশ্নটা আমার মাথায় এলো।
  • মা? মা ওই নীল শাড়িটা পরে থাকে সবসময়।
    বুতাই আইসক্রিমটা খেয়ে প্যাকেট টা রাস্তায় ফেলে দিলো। ওই নীল শাড়িটা পরেই আমি সুনিতাকে শেষ দেখেছিলাম যেদিন ও পালাল সেদিন অফিস যাওয়ার সময় তাহলে বুতাইএর মনে ও সেই স্মৃতি টা ঘিরে আছে বলেই এরকম দেখছে। কিন্তু তক্ষুনি আমার একটু চমক লাগলো কিন্তু বুতাই তো ওই ঘটনার দুদিন আগে থেকে পিসির বাড়ি ছিল। তাহলে ওর কি করে ওই নীল শাড়িটাই মনে পরছে? ঘটনা টা একেবারেই কাকতালীয়? বুঝতে পারছিনা, বেশিদিন এরকম চললে বাধ্য হয়েই ডাক্তার দেখাতে হবে। আমার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়লো। জীবনটা কেমন যেন দিশাহারা হয়ে যাচ্ছে।
    রাতে খাবার বেড়ে আমি আর বুতাই একসাথে খেতে বসি, আজ ও দেখলাম বুতাই সামনে তাকিয়ে হাসছে।
  • কি হল বুতাই? হাসছ কেন?
    আমি একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম।
  • বলা যাবেনা তোমাকে। মা বারন করেছে।
    বলেই বুতাই হেসে উঠলো জোরে। এবার আমার একটু ভয় ভয় করতে লাগলো। ছেলেটা কি সত্যি পাগল হয়ে যাচ্ছে নাকি? এই সপ্তাহেই ডাক্তার টা দেখাতে হবে মনে হচ্ছে।
    রাতে কিছুতেই বুতাই আমার সাথে শুতে রাজি হলনা। ওর মা নাকি গল্প শোনাবে রাতে ওকে। আমি আর জোর করলাম না। একা শুতে চাইলে শুক। আমিও ঘুমাতে পারবো শান্তিতে। কাল অফিস ছুটি আছে, বুতাই এর স্কুল ও নেই। কাজেই সকালে ওঠার তাড়া নেই কোন। না না জিনিস ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি আমি টের পাইনি ঘুম ভাঙল সেই আটটায়। উঠে দেখি ড্রয়িং রুমে বুতাই বসে আছে।
  • কখন উঠলি? একা একা উঠলি কি করে?
    আমি বুতাই কে জিগ্যাসা করলাম।
  • মা তুলে দিয়েছে।
    বুতাইএর কথা শুনে আমার রাগ হল। আবার এক কথা। আমি বুতাই এর পাশে গিয়ে বসলাম।
  • বুতাই শোন, মা বেড়াতে গেছে। অনেকদিন বাদে ফিরবে, তুমি তাহলে কিভাবে মাকে দেখতে পাচ্ছ বল? আমি অফিস গেলে আমাকে তুমি দেখতে পাও?
    আমি বুতাইকে জিগ্যাসা করলাম।
  • না তোমাকে পাইনা। মাকে পাই। মাকে ডাকলেই আমার কাছে চলে আসে।
    বুতাই হেসে বলল।
  • কিভাবে ডাকো মাকে?
ALSO READ  Negotiation Skill Part 2

আমি বুতাইকে জিগ্যাসা করলাম। বুতাই কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু কলিং বেলের শব্দে থেমে গেলো। এত সকালে ছুটির দিনে কে এলো আবার? একদিন ও শান্তি নেই।
দরজা খুললাম দেখি পাশের বাড়ির সরকার বাবু। এক নম্বর কুচুটে লোক। দরজায় দাঁড়িয়ে হাসছেন। যতই অপছন্দ হোক কাউকে তো আর দরজা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া যায়না।

  • আসুন সরকার দা। এতদিন পর?
    আমি সরকার বাবুকে ভেতরে নিয়ে গেলাম। উনি সোফায় বসলেন।
  • এতদিন পর মানে তোমার সাথে যা হল, সেটা নিয়ে একটু সমবেদনা জানাতে এলাম। সময় পাচ্ছিলাম না আসলে বুঝলে?
    কথাগুলো এভাবে বললেও সরকার দার চোখে আমি পরিস্কার কৌতুক দেখতে পাচ্ছিলাম। অবশ্য লোকের বউ ভেগেছে সেটা অন্য লোকের কাছে মজার ব্যাপার বটে। আমি কথার জবাব দিলাম না।
  • চা খাবেন?
    আমি কথা এড়াতে প্রশ্ন করলাম।
  • চা দাও খাই। একটা কাজের লোক রাখো বুঝলে? একা কত সামলাবে? মাত্র ৩৫ বছর বয়স।
    লোকটার হাসি দেখলেই আমার গা জ্বলে যায়। কথার ইশারা আমি ঠিক ধরতে পেরেছি।
  • এই মুহূর্তে আমার কোন প্ল্যান নেই। এখন আমার কাছে বুতাইকে মানুষ করাটাই সব।
    আমি চা এনে রাখলাম সরকার বাবুর সামনে।
  • ঠাকুরের বেদি খানা নতুন মনে হচ্ছে?

আমাদের বসার ঘর থেকে ঠাকুর ঘরটা দেখা যায়। সুনিতা যাওয়ার পর থেকে ঠাকুর ঘরটা বন্ধ থাকে। আমি পুজা দিনা। আজ খোলা দেখে অবাক লাগলো। বুতাইএর কাজ মনে হচ্ছে।

  • নতুন না। বেশ কিছুদিন আগে বানানো।
    আমি উঠে গিয়ে ঠাকুর ঘরের দরজা দিয়ে এলাম।
  • পুজা আচ্চির পাঠ তুলে দিয়েছ নাকি?

সরকার বাবু একটু নাক সিটকলেন। লোকটাকে আস্তে আস্তে আরও অসহ্য লাগছে আমার। কিন্তু ভদ্রসমাজে থাকতে গেলে একটু মানিয়ে চলতে হয়।

  • হ্যাঁ, সময় পাইনা। ঠাকুর ঘর বন্ধই থাকে।

আমি বললাম। আরও কিছুক্ষণ আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়ে সরকার বাবু উঠে গেলেন। বাঁচা গেলো উফ।

ALSO READ  বাবা এবং ইউটিউব

বুতাই তারপর আজ কিছু করেনি বা মা মা বলেনি আমার মনটা তাই আজ একটু ফুরফুরে আছে। তাহলে ডাক্তার না দেখালেও হবে। আস্তে আস্তে ব্যাপারটা কেটে যাবে হয়তো। রাতে আমরা বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করে আনিয়ে ছিলাম। খেয়ে দেয়ে আমরা তাড়াতাড়ি শুয়ে পরলাম। অনেক বলা সত্ত্বেও আজও বুতাই আমার পাশে শুল না। আমিও আর জোর করলাম না। এখনকার ছেলে মেয়েকে বোঝা খুব মুশকিল। হটাত একটা খুট করে আওয়াজে আমার ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। ঘড়ি দেখলাম রাত প্রায় ৩ টে বাজে। এত রাতে কিসের আওয়াজ হল। আমি দেখতে উঠে ড্রইং রুমে এলাম। এসেই দেখি ঠাকুর ঘরের দরজা খোলা। আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা শিরশিরানি ভাব নেমে এলো। ঠাকুর ঘর এত রাতে কে খুলল? আমি সাহসে ভর করে এগলাম। মনটা এগোতে চাইছিল না, বলছিল এগিও না বিপদ হবে কিন্তু তাও আমি কেমন জেদের বশে এগিয়ে গেলাম। হটাত একটা দৃশ্য দেখে আমার রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। বুতাই ঠাকুরের নতুন বেদির উপর কান চেপে আমার দিকে তাকিয়ে কেমন অদ্ভুত ভাবে হাসছে একটা। হাসিটা একদম স্বাভাবিক নয়। আমার ভয়ের কারণটা ছিল ওই বেদিটা বুতাইয়ের হাসি নয়। কারন ওর নীচেই আমি ………।

  • কি কি করছ বুতাই?
    আমি কাঁপা কাঁপা গলায় জিগ্যাসা করলাম। আমি টের পাচ্ছি আমার হাত ঘেমে যাচ্ছে।
  • মা বলেছিল, না এলে এখানে এসে ডাকতে। আজ এখনো আসেনি তাই ডাকছিলাম, মা আসছে এখুনি।

বুতাইএর হাসিটা যেন আরও একটু অদ্ভুত হয়ে গেলো। আমি টের পাচ্ছি আমার পা কাঁপছে, মন বলছে পালাও এখানে থাকলে বিপদ হবে কিন্তু কিছুতেই আমি পা টেনে আমি এগোতে পারছিনা।

  • মা বলছে, আজ তোমাকেও গল্প শোনাবে। কেমন ঘুরলো তার গল্প। কি মজা হবে

আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিনা। এসব বুতাই কি বলছে। সব কি ওর কল্পনা? তাছাড়া কি? আমি নিজের হাতে সুনিতা আর সুবীরকে মেরে ওই বেদির নিচে পুঁতে দিয়েছি। বুতাই যা বলছে হতেই পারেনা।

  • মা এসেছে।
    বুতাই লাফিয়ে উঠলো আনন্দে। আমি না দাঁড়িয়ে থাকতে পেরে বসে পড়লাম। টের পেলাম বেদিটার নিচ থেকে কেমন আওয়াজ হচ্ছে। তাহলে কি……………।
ALSO READ  Storytelling
What’s your Reaction?
+1
+1
11
+1
+1
+1
13
+1
+1
Author

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x