Believe in yourself
Skip to toolbar

বর্ণবৈষম্য


এক জাতি অন্য জাতি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এবং সংখ্যালুঘুদের উপর সংখ্যাগুরুদের আধিপত্য বিস্তার এমন ধারণার নামান্তরই রেসিজম বা বর্ণবাদ।

রেসিজম বা বর্ণবাদের মূলে রয়েছে অন্ধবিশ্বাস  এবং অহংকার।ধর্মযুদ্ধগুলো থেকে শুরু করে বিশ্বযুদ্ধ এবং আজ অব্দি পৃথিবীতে যত যুদ্ধ হয়েছে বা হচ্ছে তার সবকয়টির সাথেই রেসিজম ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ব্যক্তি থেকে পরিবার,পরিবার থেকে সমাজ,সমাজ থেকে রাষ্ট্র এভাবে পর্যায়ক্রমে ছোট থেকে বড় পরিসরে বিভিন্ন রূপে থাকে রেসিজম।মুখের কথায় তা আরও ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে।কানাডার অ্যালবার্টা সিভিল লিবার্টিজ রিসার্চ সেন্টার বলেছে মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে যা কিছু বলা বা লেখার মাধ্যমেও তা ব্যাপক হারে ছড়ায়।
প্রতিটি ধর্ম মানবতার কথা বললেও রেসিজমের বেড়াজাল থাকে সম্পূর্ণরুপে মুক্ত হতে পারেনি।ইহুদি ধর্মগ্রন্থে বলা হয় ইহুদীরা ঈশ্বরের পছন্দের জাতি।গ্রীক পূরাণে ও গ্রীক জাতি নিজেদের সৃষ্টিকর্তার সন্তান বলে মনে করে।এভাবেই বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে যে ধরনের হিংসার বীজ বোপন করা হয়েছে তাতে মনে হবে না যে এগুলো স্বয়ং ঈশ্বরের বাণী।একজন সৃষ্টিকর্তার কাছে তার সৃষ্টির মাঝে কোন পার্থক্য থাকতে পারেনা।শুধু ধর্মগ্রন্থই নয়, দর্শনশাস্ত্রের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ ও নিজেদের সম্পূর্ণরুপে রেসিজম হতে মুক্ত করতে পারেননি।
এরিস্টটল মনে করতেন যে, গ্রীক জাতি প্রকৃতগতভাবে মুক্ত এবং বর্বর জাতি তথা নন-গ্রীক জাতি প্রকৃতগতভাবেই দাস।কান্ট ও হেগেল মনে করতেন যে কালো মানুষের বুদ্ধি কম এবং তারা সাদা মানুষের তুলনায় নীচু জাতের।
অপরাধ বিজ্ঞানির জনক বলা হয় Cesare  Lombroso  কে।তিনি বলেছেন একজন অপরাধী জন্মগতভাবেই অপরাধী।অর্থাৎ একজন অপরাধীর পরবর্তী প্রজন্মও অপরাধী বলে বিবেচিত হবে।তার তথ্য মতে একজন অপরাধী দেখতে কেমন হবে তা নির্ভর করে ঐ ব্যক্তির মাথা উচু,ঠোঁট মোটা,গায়ের রঙ সাদা বা কালো কি না ইত্যাদি। তার এই তথ্যে সম্পূর্ণরুপে  কৃঙ্গাদের অবজ্ঞা করা হয়েছে।
আমেরিকার জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকান্ডের পর থেকে বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে উত্তাল সারাবিশ্ব।জর্জ ফ্লয়েডকে নির্বিচারে জনসম্মুখে হত্যা করা হয়।বর্ণাবাদ হতে ক্রিড়াজগত ও মুক্ত নয়।ক্রিস গেইল,ড্যারেন স্পামি,ডোয়েন ব্র‍্যাভো ইতিমধ্যেই নিজেদের মুখ খুলেছেন।স্প্যামি তো ভারতে আইপিএল খেলতে এসে সরাসরি রেসিজমের শিকার হয়েছেন।১৪বছরের জর্জ স্টিন্নি জুনিয়র আমেরিকার সবচেয়ে কনিষ্ঠ মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামি।তাকে ইলেক্টিক শক দিয়ে মারা হয়।তার উপর আনীত অভিযোগ ৭০বছর পর প্রামানিত হয় যে সে নির্দোষ ছিল।শুধুমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার কারণে তাকে কোনো প্রকার প্রমাণ করার সুযোগ দেয়া হয়নি যে সে নির্দোষ ছিল।সে ২শ্বেতাঙ্গ কিশোরিদের রেপ করেনি।এমনকি জর্জ স্টিন্নি জুনিয়র তার পিতা মাতার সাথেও সাক্ষাৎ করার সুযোগ পায়নি।উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে এখনো কৃষ্ণাঙ্গদের নানাভাবে বঞ্চিত করা হয়।নেলসন মেন্ডেলা দীর্ঘ ২৭বছর কারাগারে ছিলেন।তিনি বর্ণবৈষম্য নিয়ে প্রতিবাদ করায় তার দীর্ঘ এই কারাবাস।কিন্তু এখনো এই বর্ণ বৈষম্য বিলুপ্ত হয়নি। তার আন্দোলন এখনো সফল হতে পারেনি বলে মনে করি।কারণ কালো বলে জন্মগতভাবে নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও কৃষ্ণঙ্গরা অবহেলিত নিপীড়িত।
একটি প্রবাদ আছে-“পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা কর।”একজন ব্যক্তি কালো আরেকজন ব্যক্তি সাদা তথা গায়ের রঙ নিয়ে বিচার বিবেচনা করা রেসিজমেরই প্রতিফলন।মূলত সৌন্দর্যের ধারণা ও গায়ের রঙ,ভাষা ও ধর্ম,জাতীয়তাবাদ,আঞ্চলিকতা,ক্ষমতা,কর্পোরেট পুঁজি এবং লিঙ্গ এই বিষয়গুলোর উপর নির্ভর করেই রেসিজম টিকে আছে।
বিগত বছরের ৮ই এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ এর রূপগঞ্জে সাথি আক্তার নামে এক গৃহবধুকে তার বাড়ির একটি কক্ষ ভেঙ্গে উদ্ধার করেছিল পুলিশ।তার বর ফাহিম তাকে ৬মাস ধরে একটি কক্ষে আটকে রেখে রীতিমত অত্যাচার করেছিল।উদ্ধার হওয়ার পর তিনি পুলিশকে জানান,তাদের বিয়ের ৬বছর এবং ২টি সন্তান ও আছে কিন্তু তিনি খাটো ও কালো ফলে তিনি তার স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন এবং তাকে জোর করে বিষপান করিয়ে হত্যা করার ও চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিল তার স্বামী ফাহিম।
উপরোক্ত ঘটনায় সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা রেসিজমই প্রকাশ পেয়েছে জানতে চাইলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের উপ-পরিচালক নীনা গোস্বামী বলেন-আমরা বর্ণবাদ নিয়ে কাজ করিনা, কাজ করি নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে।
রেসিজম শুধু যে আমেরিকা, ইউরোপেই আছে তা নয়।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি আরও বিস্তৃত।ঠাট্টার ছলে অনেকেই রেসিজমের শিকার হয়ে থাকেন।করোনার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে ছোট খাটো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ চলছে।কিন্তু ঐ এলাকার মানুষকে  নিয়ে বিভিন্ন ট্রল করে পোস্ট করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।এটাও এক প্রকার রেসিজম।কোনো এলাকার ভাষাকে হেয় করার প্রবণতা ও বছরের পর বছর ধরে চলে আসচ্ছে।এগুলো বর্ণবাদ বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানী, অধ্যাপক ড.নেহাল করিম।তিনি মনে করেন  ধর্ম পালনের কিছু দিক এবং ধর্ম নিয়ে সংখ্যালুঘু ও সংখ্যাগুরুর ভেদাভেদ ও প্রশ্ন জাগায়।অধ্যাপক ড.নেহাল করিম বলেন- মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে সবাই কি সামনে দাঁড়াতে পারে?আবার ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে অন্য ধর্মাবলম্বীদের হেয় করাও তো চলছে অহরহ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর নৃ-বিজ্ঞানের শিক্ষক জোবাইদা নাসরিন কলি তুলে ধরেন আরেকটি দিক-“যারা ময়লা পরিষ্কার করেন তাদের আমরা বলি ময়লাওয়ালা।কিন্তু যারা ময়লা করে তারা সমাজে সম্মানিত।”
এটাও কিন্তু বর্ণবাদের একটি রূপ।
যে গণমাধ্যম বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কাজ করদ তারাও বর্ণবাদ বিস্তারে সক্রিয় ভূমিকা রেখে থাকে।প্রিন্ট মিডিয়ার তুলনায় ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় নারী সংবাদকর্মীদের সংখ্যা বেশি।নারী উপস্থাপক বা নারী সংবাদকর্মীদের নেয়ার জন্য যেসব গুনের কথা বলা হয় সেগুলোও বর্ণবাদী মনের প্রকাশ।
তাছাড়া বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় যখন বিয়ের জন্য পাত্র -পাত্রী খোজ করা হয় সেক্ষেত্রেও গায়ের রঙকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়।বিশেষ করে গায়ের রঙ নিয়ে মেয়েদের ভোগান্তির শেষ নেই।সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য নানান ধরনের প্রোডাক্ট ব্যবহার করে থাকেন।যেগুলোতে পারদের পরিমাণ খুব বেশি এবং স্কিন ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে।কর্পোরেট পুঁজি বর্ণবাদকে আশ্রয় করেই কিন্তু ব্যবসা করে থাকে।সেটা বিউটি প্রোডাক্ট হোক অথবা বিউটি কন্টেস্ট নারীর সাহস,যোগ্যতা আর সাফল্য খোঁজে তারা রঙ ফর্সা করার মধ্যে।তাইতো লাগামহীন ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিউটি পার্লারের সংখ্যা।বর্তমানের যত ধরনের সৌন্দর্য বর্ধন প্রোডাক্ট আছে তাতে স্পষ্টভাবে রেসিজম পরিলক্ষিত হয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আধুনিকতার ছোয়া সর্বত্র হলেও রেসিজম পূর্বেও ছিল এখনো আছে।পূর্বে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মাঝে ব্রাহ্মণ শ্রেণির লোকজন হচ্ছেন উঁচু পর্যায়ের।উনারা যে পথ দিয়ে হেটে যেতেন নিম্ন শ্রেণির লোকজন তথা শুদ্র ঐ একই পথ ব্যবহার করতে পারত না।উঁচু বংশের লোকজনদের দ্বারা নিচু বংশের লোকজন শোষিত হত।অপরাধের শাস্তির ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণদের শাস্তি কম ছিল কিন্তু শুদ্রদের কেউ অপরাধ করলে তার শাস্তি ছিল মৃত্যুদন্ড।শাস্তির ক্ষেত্রেও রেসিজম স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।
বাংলাদেশে ও মাঝেমধ্যে অবৈধ বিদেশিদের আটক বা গ্রেপ্তার করে অভিযান চালানো হয়।সব সময়ই এই অভিযান চলে আফ্রিকার নাগরিকদের বিরুদ্ধে।এখানেও সেই বর্ণবাদী মানসিকতাই প্রকাশ পায়।কালো মানুষ মানেই সে অপরাধী সে খারাপ আর সাদা মানেই সে ভালো এবং নিরোপরাধ।
বিষেজ্ঞরা মনে করেন বাংলাদেশে বর্ণবাদ আছে বলেই স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পর ২০১৪ সালে হিজড়ারা আলাদা লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।আর ভোটাধিকার পায় ২০১৯সালে।কিন্তু তারা জন্মগতভাবে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া স্বত্তেও সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা হতে বঞ্চিত এখনো নানাভাবে তাদের হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে সাদা বা কালো নিয়ে কোনো প্রকার বিরোধ সৃষ্টি করতে বারণ করা হয়েছে।
মহানবী (সাঃ) ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের যিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখে উপস্থিত জনসমুদ্রের উদ্দ্যেশে এক যুগান্তকারী ভাষণ দেন। এটি ছিল মহানবী (সাঃ) এর প্রথম এবং সর্বশেষ হজ্জ পালন।এজন্য এই হজ্জকে “হুজ্জাতুল বিদা” বা “বিদায় হজ্জ” বলা হয়।মহানবী (সাঃ) আল্লাহ সুবাহানাল্লাহ তা’আলার প্রশংসা করার পর প্রিয় নবী(সাঃ) বলেন-
*’হে মানব জাতি! মনে রেখো আল্লাহ তা’আলা একজন নর আদম এবং একজন নারী হাওয়া থেকে সবাইকে সৃষ্টি করেছেন।কোনো অনারবের উপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, তেমনি কোনো কালোর উপর কোনো সাদার শ্রেষ্ঠত্ব।একমাত্র তাকওয়াই হলো “আল্লাহ ভীতি” হলো শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি।
*হুশিয়ার!নেত্রীত্বের আদেশ কখনো লঙ্ঘন কর না।যদি কোনো কালো ক্রীতদাসকেও তোমাদের আমির করে দেয়া হয় এবং সে যদি আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদের পরিচালনা করে,তবে তোমরা অবনত মস্তকে তার আদেশ মেনে চলবে।
কারো মত বা কাজ পছন্দ না হলে তাকে শারীরিক বা মানসিকভাবে আঘাত করার প্রবণতা প্রায় সব সমাজেই দেখা যায়।এমন অসহিষ্ণু এবং বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব এর কারণে রেসিজম বিস্তার লাভ করে থাকে।বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও চিকিৎসা শাস্ত্র বিষয়ক তথ্যের উৎস সায়েন্স ডায়রেক্ট ডটকম দশ বছরের এক গবেষণা শেষে বলেছে,ইন্টারনেটের প্রসারের ফলে সাইবার দুনিয়ায় বর্ণবাদী তৎপরতা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।ব্যক্তি এবং গোষ্ঠিগতভাবে চালানো হচ্ছে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধরনের বর্ণবাদী প্রচার।যেকোনো সমাজে বর্ণবাদ রুখতে সাইবার দুনিয়ায় মানবিকতার প্রসার জরুরি।

More From Author

    None Found
ALSO READ  The Unsung Fathers of the Society - Kunal Pal : 3rd Place Winner

What’s your Reaction?
+1
8
+1
+1
13
+1
+1
+1
+1
Subscribe
Notify of
guest
4 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
4
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x