টেবিলে নাস্তা সাজানো। একাই খেতে বসল মেয়েটি। যার সঙ্গ দেওয়ার কথা সে ভোর হতেই কাজে বেড়িয়ে পড়েছে। গত দুই বছরে খাবার টেবিলে দুজন কে একসাথে খুব কমই দেখা গিয়েছে।

পাউরুটিতে মাখন লাগাতে লাগাতে মেয়েটির চোখে পুরোনো এক স্বপ্ন উঁকি দেয়। নিজের হাতে রান্না করা গরম ভাত, আলু ভর্তা, ডিম ভাজা – মানুষটি কি তৃপ্তিতেই না খাচ্ছে -মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সে – আর তার দিকে নজর পড়তেই মানুষটি পরম মমতায় নিজ পাতের খাবার তার মুখে তুলে দিচ্ছে! তিন বেলাই মেয়েটির পাতে এখন মাছ মাংস থাকবেই। তবুও তার নিরানন্দের ঘোর কাটে না। কেমনে কাটবে ! সে তো এককালে তার সমস্ত তৃপ্তি বুজে নিয়েছিল সামান্য ডাল ভাতে। প্রিয় মানুষটির আদরে খাইয়ে দেওয়া ডাল ভাতকেই সে অমৃত হিসেবে চেয়েছিল শুধু।

ভারী আসবাবে ভরা এই বিশাল অট্টালিকার দেওয়ালের মাঝে মেয়েটির দম বন্ধ হয়ে আসে। সে যে মিরপুরের ভাড়া করা ছোট এক ফ্ল্যাটেই তার মিষ্টি সংসারের স্বপ্ন বুনেছিল ! টিএসসি তে মনের মানুষটির সাথে ভিজতে ভিজতে যখন সে ঠিক করেছিল জীবনের সকল বর্ষাই সে এমন উচ্ছ্বাসে কাটাবে ; তখন কে জানত জীবনে এমন সময়ও আসবে – বৃষ্টির শব্দ তার মনের আরশি কে টুকরো টুকরো করে ভাঙবে!!

যে মেয়েটি চারশ টাকার তাঁতের শাড়ি, গলায় পুতির মালা আর খোপায় কয়েকটি কাঠগোলাপ এর সাজসজ্জায় একজনের নয়নের মণি হয়ে থাকার কথা ভাবত – সে আজ বহুমূল্য শাড়ি গয়নায় তার স্নিগ্ধতা হারিয়েছে!! এককালের রঙিন জীবন এখন ফিকে পড়েছে। গৃহকর্তা নিজের জীবন নিয়ে ভীষণ ব্যাস্ত। সম্পর্কটা যেন এক প্রকার লোক দেখানো। সে সম্পর্কের ভেতরে ভালোবাসার অস্তিত্ব নেই। আছে অর্থের অহংকার, অশ্রদ্ধা, টাকায় কেনা অধিকার ! আছে অসহায়ত্ব আর শুকিয়ে যাওয়া অশ্রু।

তবে হ্যা, মেয়েটির সাদাকালো জীবনের অতল গভীরে এক চিলতে রঙ এর ছোপ আছে -তার পুরোনো স্মৃতি আর স্বপ্ন। এগুলো নিয়ে জীবন নামের গাড়িটি দিব্যি চলছে। তবে জীবন এমন কালচে তো হবারই ছিল !! সব যে পাল্টেছে – গৃহকর্তা তার চিরায়ত প্রিয় মুখটি নয় ; পুরনো দিনের সেই মনের মানুষটি যে মেয়েটির জীবনসঙ্গি নয় !!

ALSO READ  রজনী, হিমু ও কিছু কাঠগোলাপ
What’s your Reaction?
+1
+1
4
+1
+1
+1
19
+1
+1
3
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x