ইউটিউবকে আমার কাছে একটি ট্রেনিং সেন্টার মনে হয়। যেখানে যা শিখতে চাই সবই শিখা যায় একদম বিনামূল্যে। এই কোয়ারেন্টিনে আমিও অনেক কিছু শিখেছি কিন্তু এখানে আমাকে নিয়ে কথা হবে না, কথা হবে আমার বাবাকে নিয়ে। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। তাঁকেও সবার মত ঘরে বসে অফিস করতে হয়েছে। এই অফিস করার পাশাপাশি তিনি ইউটিউবে রান্নার ভিডিও দেখে মাস্টার শেফ হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কতটা সফল হয়েছেন তা আপনারা ভালো বলতে পারবেন। আসুন তাঁর অসম্ভবকে সম্ভব করার কাহিনি শুনি –

মা গিয়েছে গ্রামের বাড়ি, রান্না করবে কে?

একটি পারিবারিক কাজে মাকে গ্রামের বাড়ি যেতে হয় প্রায় দুই সপ্তাহের জন্য। এদিকে সব হোটেল-রেস্টুরেন্ট বন্ধ। আমাদের পরিবারে মা-ই সব। তিনি তাঁর দশ হাতে সবকিছু সামলান। এখন যেহেতু তিনি নেই তখন অনন্ত জলিলের একনিষ্ঠ ভক্ত আমার বাবা বললেন, অনন্ত জলিল পারলে আমিও পারব। তাঁর এই উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে আমি ও আমার ছোট ভাই তাঁকে পূর্ণ সহযোগিতা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলাম ঠিকই কিন্তু মনে একটা সন্দেহ থেকেই গেল।

লবণের জায়গায় চিনি:

মাকে ছাড়া প্রথম দিন আমার বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি মুরগির মাংস রান্না করবেন। বাপরে বাপ! তিনি প্রথম বলেই ছক্কা মারতে চান। তখন আমি ও আমার ছোট ভাই ইউটিউব থেকে টিউটোরিয়াল খুঁজতে নেমে পড়লাম। কিন্তু ওই যে বললাম আমার বাবা অনন্ত জলিলের একনিষ্ঠ ভক্ত, তিনি আমাদের আগেই ইউটিউবের সাহায্য নিয়ে মুরগির মাংস রান্না শুরু করে দিয়েছেন। রান্নাঘরে গিয়ে দেখি একপাশে কিভাবে মাংস রান্না করতে হয় তার ভিডিও চলছে আর অন্যপাশে মনযোগ ছাত্রের মত তিনি ভিডিও দেখছে এবং কি জানি কি করছে, এটিকে রান্না করা বলব কিনা জানি না। তবুও আমরা দুই ভাই তাঁকে উৎসাহ দিতে লাগলাম।

ALSO READ  স্ব-উন্নয়ন বা সেল্ফ ইম্প্রুভমেন্ট কেনো জরুরী?

রান্না শেষ, এবার এল সেই কাঙ্খিত মুহূর্ত। আমরা খেতে বসলাম, রান্না খুবই ভালো হয়েছে কিন্তু একটু ভুল হয়ে গিয়েছে। বাবা ২য় বারের সময় মুরগির তরকারিতে লবণ দিতে গিয়ে চিনি দিয়ে দিছে। ফলে এটি লবণ-চিনির শরবতে পরিণত হয়েছে। তাই বলে আমরা উপোস ছিলাম এমন কোন ঘটনা গঠেনি, আমরা তৃপ্তিসহকারে মধ্যাহ্নভোজ করেছি। এক অন্য ধরনের রান্নার স্বাদ পেয়েছি আমরা। আমার বাবার চেষ্টার কোন কমতি ছিলনা। তিনি এই বয়সে এসে ইউটিউবে ভিডিও দেখে মুরগির মাংস রান্না করে ফেলল, এটি কোন চাট্টিখানি কথা না। তাঁর এই অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টাকে স্যালুট জানাই।

শুধু তিনি মুরগির মাংস না, তিনি বিভিন্ন টিউটোরিয়াল দেখে বিরিয়াণী, কাচ্চি বিরিয়াণী, রুই মাছ, ইলিশ মাছ, ডিমের তরকারি সহ প্রায় ১৪ দিন আমাদের দুই ভাইকে রান্না করে খাওয়াছেন। শুধুমাত্র ইউটিউবে টিউটোরিয়াল দেখে তিনি ১৪ দিনে মস্ত বড় শেফ হয়ে গিয়েছেন আমাদের দুই ভাইয়ের চোখে।

মানুষ চাইলে কি না পারে তা আমার বাবার মাধ্যমে প্রমাণিত হল। এই কোয়ারেন্টিনের ইতিবাচক দিক বলে যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে আমি বলব আমার বাবার মাস্টার শেফ হওয়ার কাহিনী।

মানবসভ্যতার মূলে রয়েছে অধ্যবসায়ের এক বিরাট মহিমান্বিত অস্তিত্ব। মানবজীবনের যেকোনো কাজে বাধা আসতে পারে; কিন্তু সে বাধাকে ভয় করলে চলবে না। জন লিলির মতে, ‘জীবনের সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে জীবনকে অস্বীকার করা।’ আমার বাবাই এই কাজটিই করেছে। তিনি সমস্যাকে এড়িয়ে যাননি। ক্রমাগত চেষ্টা করে গিয়েছেন। আমরা দুই ভাই তাঁর কাছ থেকে যে শিক্ষাটা পেয়েছি যদি করোনা বা লকডাউন না আসত তাহলে অধ্যবসায়ের মতো মহৎ গুণটিকে আয়ত্ত করতে পারতাম না। আমার বাবাই জানত না তাঁর মধ্যে রান্না করার এই সু্প্ত প্রতিভাটি লুকিয়ে ছিল। আমরা তাঁকে নিয়ে গর্ববোধ করি।

করোনাভাইরাসের কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে, যার প্রভাব পরিবেশে লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশ্বের হাজার হাজার শহর লকডাউনে থাকায় ব্যস্ততম জায়গাগুলো এবং পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কলকারখানা ও যানবাহন বন্ধ হওয়াতে বিদুৎ, গ্যাস ও তেলের জ্বালানি হ্রাস পেয়েছে এবং চাহিদা কমেছে, যার ফলে বায়ু ও পানি দূষণ কমতে শুরু হয়েছে। কৃত্রিম লেকগুলোতে জাহাজ, লঞ্চ, নৌকা ইত্যাদির চলাচল হ্রাস পাওয়াতে পানি দূষণও কমতে শুরু করেছে। নদী ও লেকের পানি অনেকাংশে সচ্ছ হয়েছে, যা জলজ প্রাণির জন্য সুবিধাজনক। ইঞ্জিনচালিত নৌকা থেকে জ্বালানি তেলের মাধ্যমে পানি দূষিত হচ্ছে না।

ALSO READ  বুক রিভিউ : কমিউনিকেশন হ্যাকস

এর পাশাপাশি আমার বাবাও রান্না করা শিখে গেল, আমার মার কষ্টও কমে গেল।

What’s your Reaction?
+1
+1
6
+1
+1
+1
9
+1
+1
Author

Desire to achieve goals in life. Be it small or big, having goals will always make life interesting. Being a better person than who I am today. And How to be a better person: Being happy and spreading love <3 :) Life is always interesting, Living in the present with the anticipation of future mixed with few lessons from the past.

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x